সেবা নিতে এসে এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা তো সাধারণ জনগণ। আপনাদের কাছে কিছু চাই না, শুধু সেবা চাই। তাও তো ফাও করেননি, সব টাকার বিনিময়ে। তাহলে কেন আমাদের এত ভোগান্তি করছেন? আল্লাহর ওয়াস্তে এ ভোগান্তি থেকে আমাদের রেহাই দেন।’
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সেবা নিতে গিয়ে এমন ভোগান্তির অভিযোগ করছেন নাগরিকরা। সরেজমিনে দেখা যায়, সফটওয়্যারজনিত সমস্যায় বাংলা নামের বানান ভুল হওয়া, সার্ভার জটিলতা, তথ্য সংশোধনে দীর্ঘ সময় লাগা এবং অতিরিক্ত নথিপত্র চাওয়ার মতো সমস্যায় পড়ছেন অনেকে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে না পাওয়া এবং সেবা দিতে অনীহার অভিযোগও রয়েছে।
প্রায় দেড় মাস ধরে শাশুড়ির মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য ঘুরছেন জেসমিন আহমেদ। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলেও মৃতের জন্ম নিবন্ধন না থাকায় নতুন করে জন্ম নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় যেতে হচ্ছে তাকে।
জেসমিন আহমেদ বলেন, ‘আমার শাশুড়ির মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সব ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি। তারা ওকে বলেছে। শুধু একটা নামের জন্য—বাংলায় নেই, ইংরেজিতে আছে। এর জন্য আমাকে আবার জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে হবে। এ জন্য আবার দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। এটা আমার জন্য বেশ ভোগান্তির।’
আরও পড়ুন:
সেবাগ্রহীতাদের অনেকে বলছেন, পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা গেলে ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে অফিসে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও সেবা দেয়ার বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সফটওয়্যার ও বিডিআরআইএস সার্ভারের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে সেবা দেয়া সম্ভব হয় না। নিবন্ধন নীতিমালার বাইরে যাওয়ারও সুযোগ নেই তাদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নাল মোল্লা বলেন, ‘যদি এরকম কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই সেটা আমরা দেখব, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি না হয় এবং দ্রুত কীভাবে সেবা দেয়া যায়।’
নিবন্ধনের বাইরে অর্ধেকের বেশি মানুষ
দেশে কত শতাংশ মানুষ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আওতায় এসেছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্যও সরকারের কাছে নেই। বেসরকারি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জন্ম নিবন্ধনের হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় এ হার কম।
স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে জন্ম নিবন্ধন হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ। এর মধ্যে সংশোধনের আবেদন ছিল ৭৯ লাখের বেশি। জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লাখ, যা মোট জন্ম নিবন্ধনের মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
মৃত্যু নিবন্ধনের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে দেশে মৃত্যু নিবন্ধন হয়েছে ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫৬৬টি, যা ওই বছরের মোট জন্ম নিবন্ধনের মাত্র ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৫৪ লাখ। একই সময়ে মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন পড়েছে প্রায় ৬ লাখ।
আরও পড়ুন:
সফটওয়্যার আধুনিকায়নের উদ্যোগ
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার ভোগান্তি কমাতে বিডিআরআইএস সফটওয়্যার আধুনিকায়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়।
রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিডিআরআইএসের দ্বিতীয় সংস্করণ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সফটওয়্যারটি একটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। আধুনিক, শক্তিশালী ও নিরাপদ সফটওয়্যার তৈরির মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জন্মের এক বছরের মধ্যে নিবন্ধনের তথ্যসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যান সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করতে পরিসংখ্যান বিভাগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।’
সঠিক তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা কঠিন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জনসংখ্যা ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য না থাকলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যনীতি, জনসংখ্যানীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যথাযথভাবে প্রণয়ন করা কঠিন। তাই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
জনমিতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোকেও এ কাজে আরও সক্রিয় করতে হবে। দেশের জনসংখ্যার সঠিক হিসাব জানা এবং গুণগত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’





