১০ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া, ফের আলোচনা করবেন আনোয়ার

আনোয়ার ইব্রাহিম আর মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট
আনোয়ার ইব্রাহিম আর মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট | ছবি: সংগৃহীত
0

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে প্রায় ১০ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীও ছিল বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরে রোহিঙ্গাসহ আরও মিয়ানমারের নাগরিককে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তুলবেন তিনি।

গতকাল (মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর) মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে এক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত আকাশ ও সমুদ্রপথে প্রায় ১০ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ছাড়াও আরাকান, কারেন ও শান জাতিগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন।’

তবে সর্বশেষ ১ হাজার ৪৭৬ জনকে ফেরত পাঠানোর দলে কোনো রোহিঙ্গা ছিলেন না বলে স্পষ্ট করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। ২৯ সেপ্টেম্বর ওই ১ হাজার ৪৭৬ জনকে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজে করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এটি প্রায় ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠানোর একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ ছিল।

আনোয়ার বলেন, ‘মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আলোচনা করা হবে।’ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে কুয়ালালামপুরের অন্যতম শর্ত হলো—মিয়ানমারকে নিজ দেশের নাগরিকদের গ্রহণ করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আনোয়ারের দাবি, এখন পর্যন্ত যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারা প্রত্যাবাসনে সম্মতি দিয়েছেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ

মালয়েশিয়ার এই প্রত্যাবাসন কর্মসূচি নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা নিরাপত্তাঝুঁকি, নিপীড়ন বা অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখে পড়তে পারেন।

বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বহীনতা, বৈষম্য ও সহিংসতার মুখে রয়েছে। ফলে তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে আনোয়ার ইব্রাহিম এসব উদ্বেগের জবাবে বলেছেন, মিয়ানমার সরকার তাদের নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণের নিশ্চয়তা দিয়েছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া যদি মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ না নেয়, তাহলে দেশটিতে থাকা এই জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানের আর কোনো পথ নেই।

মালয়েশিয়ায় দুই লাখের বেশি মিয়ানমারের নাগরিক

মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক মিয়ানমারের নাগরিক বসবাস করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে নিবন্ধিত শরণার্থীদের মধ্যে রোহিঙ্গার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। মালয়েশিয়া জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ নয়; ফলে দেশটির আইনে শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে জনমতও কঠোর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সম্পর্কে নানা বিরূপ ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

আরও পড়ুন

এদিকে, শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ভূমিকা নিয়েও মালয়েশিয়া পর্যালোচনা করছে। আনোয়ার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে চলা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনা করবে তার সরকার।

মিন অং হ্লাইংয়ের মালয়েশিয়া সফর

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান মিন অং হ্লাইং চলতি সপ্তাহে মালয়েশিয়া সফর করছেন। ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক অভ্যুত্থানের পর এটি তার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মালয়েশিয়া ছাড়াও থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টকে তাদের দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে জানিয়েছেন আনোয়ার।

তবে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি বিবেচনার ওপর জোর দিচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স, এপি ও বার্নামা

জেআর