Recent event

দল-মত নির্বিশেষে সবার মান-ইজ্জত ও অধিকারের সুরক্ষা দেবে জামায়াত: শফিকুর রহমান

জাতির উদ্দেশে দেয়া পুরো ভাষণ

বক্তব্য রাখছেন জামায়াত আমির
বক্তব্য রাখছেন জামায়াত আমির | ছবি: এখন টিভি
0

মানবিক ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সবার মান-ইজ্জত ও অধিকারের সুরক্ষা দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় ও জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠন করলে প্রথম দিনে ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব।

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আজ (সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। ভাষণটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়।

তিনি বলেন, ‘এ বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখব—আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল।’

ক্ষমতায় গেলে জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত পরিকল্পনা পরের দিন থেকেই বাস্তবায়নের কাজে লেগে পড়বে বলেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যেখানে কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।’

ভাষণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জুলাইয়ের শহিদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন, একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহিদদেরও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এখনও বহু মানুষ আহত আছেন; তিনি তাদের দ্রুত আরোগ্য ও সুস্থতা কামনা করেন।

তিনি বলেন, ‘জুলাই হয়েছিল কারণ আমাদের দেশ এক হয়েছিল। জুলাইতে রাস্তায় নেমেছিল আমার তরুণ বন্ধুরা। রাস্তায় নেমেছিল আমাদের প্রিয় মা-বোন-মেয়েরা। রাস্তায় নেমেছিল শ্রমিক, রিকশাশ্রমিক ভাইয়েরা এবং সকল মেহনতি জনতা। ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তখন এক হয়েছিল। শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ সব শ্রেণির পেশাজীবী মানুষও রাস্তায় নেমে এসেছিল। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও সে সময়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন। আমরা জুলাই আর চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনো দিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়। আমাদের বুঝতে হবে, জুলাই কেন হয়েছিল। জুলাই হয়েছিল একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই হয়েছিল একটা কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য। যুগের পর যুগ ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পরিবারতন্ত্রের হাতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে; সেখান থেকে মুক্তির জন্য। বিশেষ করে, ২০০৯ সাল থেকে জাতির উপর এমন এক শাসকগোষ্ঠী চেপে বসে যারা মানবাধিকার, ভোটাধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনের নামে তামাশার মাধ্যমে আমাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এই সব নিপীড়ন থেকে মুক্তি ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যই এসেছিল রক্তাক্ত জুলাই।’

তরুণরা এখন একটা নতুন দেশ দেখতে চায় উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে ‘‘নতুন বাংলাদেশ’’ বা ‘‘বাংলাদেশ ২.০’’। এক কথায় যদি বলি, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী; কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার সুযোগ থাকবে না। এ সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হিম্মত সবার থাকে না। এই হিম্মত দেখিয়েছে আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদি ও তাদের সহযোদ্ধারা। তাদের রক্তের শপথ নিয়ে নতুন প্রজন্মের লাখ লাখ সাহসী সন্তান আজ এ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত।’

তিনি বলেন, ‘এই দেশ আমাদের সময়ের এ সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণরাই রচনা করবে।’

তিনি তরুণদের পরিশ্রমী, সাহসী ও মেধাবী উল্লেখ করে বলেন, ‘তরুণরা পরিবর্তনকে ভালোবাসে। এই তরুণরা নতুনকে আলিঙ্গন করে। এই তরুণরা সত্য বলতে দ্বিধা করে না। এই তরুণরা প্রযুক্তি বোঝে এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে জানে। তারাই পারবে নতুন বাংলাদেশ গড়তে। আমরা তোমাদের হাত ধরতে চাই। জুলাইয়ের মতো—কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে সঙ্গী হতে চাই। প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। দেশটা বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকুক, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরুক—এই আমাদের চাওয়া। সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই। এমন বাংলাদেশ, যেখানে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না। এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।’

জনগণ একটু নিরাপত্তা, সুশাসন ও ইনসাফ চায় উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আগামীর বাংলাদেশকে এসব অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে; কিন্তু এসব পরিকল্পনার সবগুলো যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তেমনি অনেকগুলো একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি এবং এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখাসহ সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এ গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’-এর পক্ষে ভোট চাই।’

নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার আলোকে জামায়াতের সব পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরাই প্রথম ‘‘পলিসি সামিট’’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-কৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় দেশের এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা অবদান রেখেছেন। এছাড়াও আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে বসেছি এবং তাদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ নিয়েছি। আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ও জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠন করলে—প্রথম দিনেই ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করবো।’

বিগত শাসক শ্রেণি সরকারি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেদের দেশের মালিক গণ্য করেছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ, পদ-পদবি, নীতি ও প্রতিষ্ঠান—সবকিছু ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে চুরি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রতারিত করে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প ব্যক্তিগত ও দলীয় লুণ্ঠনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অতীতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ, সরকার ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন; তারা কেউই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হননি। তারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনারা দেশের মানুষ, আপনারাই তার সাক্ষী।’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে একটি নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক মহাসুযোগ হিসেবে এসেছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন। তাই জনগণকে ঠিক করতে হবে আমরা আমাদের নিজেদের জন্য, আমাদের তরুণদের জন্য; আমাদের নারীদের জন্য, বয়স্ক মানুষের জন্য, প্রান্তিক মানুষের জন্য, শ্রমিকের জন্য ও উদ্যোক্তাদের জন্য কোন বাংলাদেশ চাই। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চাই? আমরা কি নিয়মনীতি ও শান্তির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? আমরা কি উন্নত দেশ হতে চাই? আমরা কি শোষণ-জুলুম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজমুক্ত রাষ্ট্র চাই? আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাই? যোগ্যতা ও সততাকে সরকারি পদের জন্য মৌলিক শর্ত করতে চাই? আমরা কি আমাদের জাতীয় সক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে চাই? এসব বিষয়ে যদি আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাই, তাহলে আমাদের আগামী নির্বাচন নিয়ে নৈতিকভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরির বাইরে এসে বাস্তবতার আলোকে সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

দলীয় নির্বাচনি ইশতেহারের বিষয় উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে ‘‘হ্যাঁ’’ এবং ৫টি বিষয়ে ‘‘না’’ বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা ‘‘হ্যাঁ’’ বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত ও নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে স্পষ্ট করে ‘‘না’’ বলতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বড় একটি দেশ। এ জনসংখ্যাকে অনেকে সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলেও আমরা মনে করি এটি আল্লাহর নেয়ামত এবং এক বড় সম্পদ। তাই আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে নীতি ও নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প নেই। সমাজে নীতি-নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারেনি; আমাদের পক্ষেও সম্ভব না। যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। করপোরেট জগৎ থেকে রাজনীতি—সবখানে তাদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই। আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যেখানে কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।’

সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সকলকে মর্যাদা দিতে হবে এবং সকলের মানবাধিকার সুরক্ষা দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সকল পরিচয় নির্বিশেষে আমরা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি যে, একটি মানবিক ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য দল-মত নির্বিশেষে সকলের মান-ইজ্জত ও অধিকারের সুরক্ষা দেব। এ বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করবো।’

ওলামায়ে কেরামদের উদ্দেশ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘একাধিক ধর্মের এ দেশে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই মুসলমান হিসেবে এটি আমাদের দায়িত্ব যে সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো ইসলামের শাশ্বত আদর্শ। সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব; এটি আল্লাহ আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ দায়িত্ব আমরা সকলে মিলেই পালন করবো।’

ভাষণে বাদ যায়নি তাবলীগ জামাতও। তিনি তাদের ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেন, ‘আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আপনারা আমাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলেও আমরা বিশ্বাস করি। আমরা অঙ্গীকার করছি ভবিষ্যতে কেউ আপনাদের অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ‘‘ট্যাগ’’ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। বিচারবহির্ভূতভাবে আপনাদের হত্যা করতে পারবে না। আমরা জানি অতীতে আপনাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোই হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় নীতি-পদ্ধতিতে আপনাদের আনুষ্ঠানিক অবদান ও ভূমিকাকে জোরদার করা হবে।’

আন্তর্জাতিক ও জলবায়ু প্রসঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা অন্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করব, তেমনি সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেব। তবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ, বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।’

প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। এরইমধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন। আগামী দিনে দেশ গড়ার এই অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের ‘‘নতুন বাংলাদেশ’’-এর স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা চাই প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে। সে লক্ষ্যেই প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে—যারা প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও সমস্যার বিষয়ে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সাথে সরাসরি সমন্বয় করে প্রবাসীদের স্বার্থে উপদেষ্টা ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন। প্রবাসীরাও যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সকল রাজনৈতিক দলের জন্য একটি বিরাট নৈতিক দায়িত্ব উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের আহ্বান হবে নির্বাচনি আচরণবিধিকে সম্মান জানানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বৈধ অধিকারকে সম্মান করা। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা অনেক কষ্ট করে আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করেছেন; আপনাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। আপনাদের ঋণ শোধ করতে পারবো না।’

তিনি বক্তব্যে দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং নির্বাচনি জোটের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম ও আর্থিক ত্যাগের স্বীকৃতি দেন। স্মরণ করেন শেরপুরের জামায়াত নেতা রেজাউল করিম এবং দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলকে, যিনি শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী ছিলেন।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে আমানত উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখব—‘‘আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’’। আমরা হযরত ওমরের (রা.) সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখব যে, “ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকব”। আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব, ইনশা আল্লাহ।

‘আশা করি আপনারা আমাদের অঙ্গীকার ও স্বপ্নকে বিশ্বাস করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের প্রতি সমর্থন দেবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ‘‘দাঁড়িপাল্লা’’ মার্কায় এবং যেসব অঞ্চলে ১১ দলীয় প্রার্থী আছে সেসব এলাকায় ১১ দলীয় প্রতীকে ভোট দেবেন—এই আকুল আবেদন আপনাদের প্রতি রাখলাম। আল্লাহ পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ আমাদের দিয়েছেন, আসুন সেটা কাজে লাগাই। বিগত দিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি; যেখানে সবাই মান-ইজ্জত ও মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।’

এনএইচ