দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও কামরুজ্জামান বিএনপির রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইন উপদেষ্টা হিসেবেও পরিচিত। দলের কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে তার রাজনৈতিক ও আইনগত সম্পৃক্ততার কারণে অনুসারীদের কাছে তিনি ‘দুঃসময়ের কাণ্ডারি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
তবে পার্বতীপুরের রাজনীতিতে তার পথচলা সহজ ছিল না। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে তাকে স্থানীয় রাজনীতিতে আড়ালে রাখার চেষ্টা হয়েছে। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই বিএনপি দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর–ফুলবাড়ী) আসনে তার হাতে তুলে দেয় ধানের শীষ।
নির্বাচনে কামরুজ্জামানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ান বিএনপির তৎকালীন স্থানীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। শেষ পর্যন্ত রেজওয়ানুল হক নির্বাচনে জয়ী হন এবং কামরুজ্জামান পরাজিত হন।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মূল্যায়ন, একই রাজনৈতিক বলয়ের দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির ভোট ও সাংগঠনিক শক্তিতে বিভাজন তৈরি করেছিল, যার প্রভাব পড়ে ধানের শীষের ফলাফলে। রেজওয়ানুল হকের দীর্ঘদিন সক্রিয় রাজনীতি থেকে তুলনামূলক দূরে থাকা এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা নিয়েও প্রতিপক্ষ মহলে নানা আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পরও কামরুজ্জামান মাঠ ছাড়েননি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রেখে দলকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করার কার্যক্রমে সক্রিয় থাকেন। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ২০ আগস্ট তাকে পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভক্তি কাটিয়ে সংগঠনকে নতুনভাবে সাজানোর ক্ষেত্রে তার এই দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এর মধ্যেই কামরুজ্জামানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, বিএনপির আসন্ন কাউন্সিলে ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানকে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। ফলে বিষয়টি সম্ভাবনা ও দলীয় সূত্রের তথ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের অভিজ্ঞতা এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্কের কারণে এমন একটি দায়িত্বে তার নাম আলোচনায় আসাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন তার ঘনিষ্ঠরা।
নতুন উপজেলা আহ্বায়ক হিসেবে কামরুজ্জামানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভক্তি কাটিয়ে তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করা, পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা এবং পার্বতীপুরে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
ব্যালটের হিসাবে তিনি পরাজিত, কিন্তু রাজনীতির হিসাবে তার সামনে খুলছে নতুন অধ্যায়। ধানের শীষের প্রার্থী থেকে পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক—আর এখন কেন্দ্রীয় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার সম্ভাবনার আলোচনায় ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান।
পার্বতীপুরের রাজনীতিতে তাই নির্বাচন-পরবর্তী সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন এখন আর শুধু তার পরাজয় নয় বরং কামরুজ্জামানের এই সাংগঠনিক উত্থান শেষ পর্যন্ত কতদূর যায়।





