ঐতিহ্যের নববারতা: বাংলা নববর্ষের শিকড় ও সমকাল

বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা
বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা | ছবি: এখন টিভি
1

হাজার বছরের ঐতিহ্য আর বাঙালির প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আবারও দুয়ারে কড়া নাড়ছে পহেলা বৈশাখ। এ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর এক মহতী লগ্ন। ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা পথ পেরিয়ে বাংলা নববর্ষ আজ যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা যেমন গৌরবের, তেমনি সংগ্রামের।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে পাওয়া যায় এ দেশের কৃষি ও খাজনা আদায়ের এক চমৎকার সমন্বয়। ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল সম্রাট আকবরের আমলে হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করতে গিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হতো। চান্দ্র মাসের হিসাব কৃষকদের ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে মিলত না বলে অসময়ে খাজনা দেয়া ছিল দুঃসাধ্য।

এ জটিলতা নিরসনে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর তার রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে একটি নতুন সৌর সন প্রবর্তনের দায়িত্ব দেন। ফসল কাটার সময়কে ভিত্তি করে তৈরি এই ‘ফসলি সন’ কালক্রমে আজকের ‘বাংলা সন’। মূলত অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই পঞ্জিকার জন্ম হয়েছিল।

আরও পড়ুন:

এক সময় বৈশাখ মানেই ছিল গ্রাম ও শহরের ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ করার মহোৎসব। লাল সালুতে মোড়ানো নতুন হিসাবের খাতা খোলা হতো পহেলা বৈশাখে। পুরনো বছরের সব দেনা-পাওনা চুকিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মিষ্টিমুখের মাধ্যমে গড়ে উঠত এক আত্মিক সম্পর্ক। আধুনিক ব্যাংকিং ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হালখাতার সেই জৌলুস কিছুটা ম্লান হলেও, ঐতিহ্যের টানে আজও অনেক পুরান ঢাকা বা গ্রামবাংলার জনপদে টিকে আছে এই প্রথা।

‘পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা মূলত বাঙালি। আমাদের এই উৎসব কোনো বিশেষ ধর্মের নয়, এটি আপামর জনতার’— সংস্কৃতিকর্মীদের দীর্ঘদিনের লালিত এই চেতনা আজও অটুট।

আরও পড়ুন:

পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতিকে যখন দমনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে প্রতিরোধের এক অনন্য হাতিয়ার। ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান ছিল না, ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনেরই অংশ।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এ উৎসবকে নতুন মাত্রা দেয়। অশুভ শক্তিকে বিনাশ আর কল্যাণের বারতা নিয়ে বের হওয়া এই পদযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর ‘বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা পহেলা বৈশাখকে বৈশ্বিক মর্যাদায় আসীন করেছে।

আরও পড়ুন:

বর্তমান সময়ে পহেলা বৈশাখ কেবল রমনার বটমূল বা চারুকলায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশজুড়ে বৈশাখী মেলা, পান্তা-ইলিশের আমেজ আর নাগরদোলার কিড়িং-কুড়িং শব্দে মুখরিত হয় জনপদ। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও বাঙালির এই প্রাণের উৎসব হারায়নি তার জৌলুস। বরং বিদেশে অবস্থানরত লাখো প্রবাসী বাঙালির মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ এখন নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ আজ বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। জীর্ণ পুরাতনকে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুনের আহ্বানে বাঙালি আজও গেয়ে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।

এনএইচ