গতকাল (মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল) রাত বারোটার পর থেকে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী নদীর পানি, বর্তমানে ১১৫ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়াও মনু, ধলাই, কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে, তবে বৃষ্টি কিছুটা কম হওয়াতে কমছে জুড়ি ছাড়া অন্য তিনটি নদীর পানি।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন অলিদ জানান, উজানে বৃষ্টিপাতের কারণে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুপুর ৩ টার হিসেব অনুযায়ী মনু নদীর পানি রেলওয়ে ব্রিজ এলাকায় বিপৎসীমার ৩২০ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে ও চাঁদনীঘাট এলাকায় ১৪২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে, ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৪৪ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে ও শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ২৪৪ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, মনু নদীর বেড়িবাঁধের তিনটি জায়গায় ও ধলাই নদীর দুটি জায়গায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে, এগুলোতে এখনো কাজ শুরু করা যায়নি। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ও উজানে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি জানান, মুষলধারে বৃষ্টির কারণে জেলার কিছু কিছু এলাকায় ছোট ছোট নদী বা ছড়ার বাঁধ ভেঙ্গে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়ে মানুষের ঘরবাড়িসহ ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় ও উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাবে আগামী তিনদিনের মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আনিছুর রহমান জানান, ২৫ এপ্রিল শনিবার সকাল ৬টা থেকে ২৬ এপ্রিল রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৩০ মিলিমিটার, ২৬ এপ্রিল রবিবার সকাল ৬টা থেকে ২৭ এপ্রিল সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৫০ মিলিমিটার ও ২৭ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ২৮ তারিখ দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ তিন দিনে মোট ৩১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জালাল উদ্দিন জানান, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অত্যধিক বৃষ্টিপাতে মৌলভীবাজার জেলায় ৮৯৭ হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এরমধ্যে সদরে ৪৭০ হেক্টর, রাজনগরে ১৪০ হেক্টর, কমরগঞ্জে ৭০, শ্রীমঙ্গলে ২১৭ হেক্টর রয়েছে।
তিনি আরও জানান, হাকালুকি ও অন্যান্য হাওরের নিম্নাঞ্চলের ৮২ ভাগের ওপর ধান কাটা শেষ হয়েছে। উচুস্থানে ২২ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এছাড়াও আউশ বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৯১৫ হেক্টরের মধ্যে অর্জিত ৪০১ হেক্টরের মধ্যে ১৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে গ্রীষ্মকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ৯৫ হেক্টর, অর্জিত হয়েছে ৬ হাজার ১১৫ হেক্টর, এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা ১৭২ হেক্টর।
এদিকে বৈশাখি ঝড়ের কবলে পড়ে জেলায় ৮৫৫টি কাঁচা ও আধপাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে কমলগঞ্জে ১৭৭টি, শ্রীমঙ্গলে ২৫০টি, কুলাউড়ায় ৩৩০টি ও রাজনগরে ৯৮টি ঘর রয়েছে। এরইমধ্যে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১০০ টন জিআর চাল ও নগদ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাদু মিয়া।
বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ১৯০ মিলিমিটার রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজার স্টেশনে, যা এযাবতকালে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এরপর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ১৮০ মিলিমিটার রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজারের শেরপুরে এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ১৮৯ মিলিমিটার, তিনদিনে ৩১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।





