অন্যদিকে বিআরটিসির যে বাসের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে সেটির ফিটনেস মেয়াদও ফুরিয়েছে ২ বছর আগে। সরকারি বাস হলেও ৩ বছর ধরে দেয়া হয়নি কোনো ট্যাক্স।
এদিকে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
গতকাল (রোববার, ২৪ মে) বেলা পৌনে ১১ টার দিকে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশায় যাত্রীবাহী বিআরটিসি বাস ও একটি অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাদারীপুরের দুই ভাই, তাদের দুই স্ত্রী ও অ্যাম্বুলেন্স চালক সহ মোট পাঁচজন নিহত হন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর থেকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। পথে শংকরপাশা এলাকায় একটি ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ফরিদপুর থেকে ঢাকাগামী বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সটির সংঘর্ষ হয়। দুমড়ে মুচড়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সটি। এতে ঘটনাস্থলেই অ্যাম্বুলেন্সের চালকসহ পাঁচজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন, মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেন (৫৮), তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন (৬২), তাদের পিতার নাম হাজী আব্দুল ওয়াহেদ মোল্যা, আলমগীর হোসেনের স্ত্রী খুশি বেগম (৪৫) এবং জাহাঙ্গীর হোসেনের স্ত্রী মাজেদা বেগম (৫০)। এছাড়া নিহত অ্যাম্বুলেন্স চালক কাউছার হোসেন (২৫) মাদারীপুর সদর এলাকার শাহজাহান মাতুব্বরের ছেলে।
স্বজনরা জানান, পরিবারের অসুস্থ এক সদস্যকে চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ফরিদপুর বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক পলাশ খীসা জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলের পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে গাড়ির নাম্বার দেখে অবাক হয়ে যাই। মূলত অ্যাম্বুলেন্স এর সিরিয়াল শুরুতে ‘ছ’ লেখা থাকে। ট্রাক এর শুরুতে লেখা থাকে ‘ঠ’। যে অ্যাম্বুলেন্সটি (ঢাকা মেট্রো ঠ ১১- ১২২৯) দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে সেটি মূলত একটি পিকআপ বা ছোট ট্রাক ছিল। এটিকে মডিফাই করে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়েছে।
২০০৯ সালের ১৫ মে মালিক হিসেবে মোবারক হোসেন নামের এক ব্যক্তি সর্বশেষ গাড়িটির ফিটনেস ও ট্যাক্স পরিশোধ করেন। তার পিতার নাম নুরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা। তবে ধারণা করা হচ্ছে গাড়িটির হাতবদল হয়েছিল।
তিনি আরো জানান, দুর্ঘটনা কবলিত বিআরটিসি বাসেরও (ঢাকা মেট্রো- ব ১৫ - ৬৪৩৬) ফিটনেস সনদ ছিল না। যেহেতু ফিটনেস সনদ ছিল না তাই গাড়িটি চলাচলের উপযোগী ছিল কিনা তা নিশ্চিত নয়। গাড়িটির ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ফিটনেস এর মেয়াদ শেষ হয়। ৫ ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে কর পরিশোধ করেনি।
সহকারী পরিচালক আরো জানান, এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ওই কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে আমি রয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ফরিদপুর জেলা শাখার সভাপতি আবরার নাদিম ইতু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ মৃত্যু দুর্ঘটনা তা মানতে আমি রাজি নই। এগুলোও হত্যাকাণ্ড। কিভাবে ১৭ বছর একটি অ্যাম্বুলেন্স কাগজপত্র ছাড়া রাস্তায় চলতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘কিভাবে সরকারি বিআরটিসি বাসের তিন বছর ফিটনেস থাকে না। সরকারি গাড়ি কেনো তিন বছর ট্যাক্স দেয়া হয় না। কর্তৃপক্ষের কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি যে নাই এ দুর্ঘটনা তারই প্রমাণ। এদের উদাসীনতায় প্রতিদিন সড়কে নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন আশা করা যায় না।’
ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন জানান, ৫ জন নিহতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেনি। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, পরিবারের লোকজন অসুস্থ থাকায় তারা আসেননি। তবে তারা জানিয়েছেন দু-একদিনের মধ্যে এসেই মামলা দায়ের করবেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহাকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন বিআরটিএর ফরিদপুরের সহকারী পরিচালক পলাশ খীসা। সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও বুয়েটের একজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহা জানান, আমাকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঈদের ছুটির পরেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।





