অন্যদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়েছে ২২ ফুট। এতে কাপ্তাই হ্রদ তীরবর্তী ৬ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে নতুন করে বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে দুর্যোগে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
রাঙামাটিতে অতিবর্ষণে পাহাড়ধস ও বন্যায় দুর্যোগ পরিস্থিতিতে জেলার ৯ উপজেলা ও ২ পৌর এলাকায় ৭ হাজার ৬৪৬ পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। আর ৭ উপজেলায় ১৩৫টি ছোটবড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টিপাত কমে আসায় অনেকে এরমধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়েছেন। এরপরও সোমবার পর্যন্ত জেলার ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫৮৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
দুর্যোগে জেলায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। সেতু ধসে তিনদিন ধরে বন্ধ রয়েছে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক। সড়ক ধসে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাথে পাঁচদিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ায় বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, নানিয়ারচর ও লংগদু উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে নতুন করে বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে। ১০৯ ফুট এমএসএল (মিন সি লেভেল) ধারণক্ষম কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা রবিবার ১৩ জুলাই দুপুর দুইটা পর্যন্ত ছিল ১০০ দশমিক আট শূন্য ফুট। অবশ্য পানি বাড়ায় দেশের একমাত্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৬ মেগাওয়াট। যা সরাসরি যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে।
দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা প্রাপ্তির পরিমাণ, বণ্টন, আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত মানুষের সংখ্যা, সড়ক, সেতু কালভার্ট, ক্ষেত-ফসল সহ সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ নিয়ে এই প্রথম বারের মতো জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের লুকোচুরি, সমন্বয়হীনতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও স্থানীয় প্রশাসন থেকে যথেষ্ট ত্রাণ সরবরাহের দাবি করা হচ্ছে।
বাঘাইছড়িতেই প্রথম নিম্নাঞ্চল ডুবতে শুরু করে। সেখানে ৭ হাজার পরিবারের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। এসব এলাকায় অভ্যন্তরীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পুকুর, মাছের ঘের ও বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। ঘরবাড়ি, সহায় সম্পদ, গরুছাগল হাঁসমুরগি রেখে যারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি। আবার আশ্রয়কেন্দ্রে এসেও নিয়মিত খাবার, শিশুখাদ্য, ঔষধ, সুপেয় পানি, ত্রাণসহ সরকারি সহযোগিতা না পাওয়া নিয়ে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গণমাধ্যমে প্রচারের পর বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ১১শ জন আশ্রয় নেয়ার তথ্য সংশোধন করে মাত্র ৮২ জনে নামিয়ে আনে জেলা প্রশাসন।
মুসলিম ব্লক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে তিনদিনে একবেলা খাবার দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার ৯ জুলাই ১২৯ পরিবার পানিবন্দী থাকার কথা বললেও এর চারদিনের মাথায় আজ ১৩ জুলাই বলা হয়েছে-৭ হাজার ৬শ ৪৬ পরিবার পানিবন্দী রয়েছে।
৮ জুলাই রাতে আকস্মিক বন্যায় বিলাইছড়ির ফারুয়ায় ৬ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়লেও চারদিন পর ১২ জুলাই ২শ' জনকে দেয়া হয় ১০ কেজি করে সরকারি চাল। যেখানে ফারুয়া বাজারের দেড় শতাধিক দোকান ডুবে যায়।
সর্বশেষ রবিবার রাতে শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে বয়স্কদের খাবার দেয়া হলেও বাচ্চাদের না দেয়ায় খাবার বর্জন করেন দুর্গতরা। এমনকি এই দুর্যোগে সরকারি খাদ্যশস্য ও অর্থ বরাদ্দসহ বিভিন্ন সহায়তার পরিমাণও প্রকাশ করা হয়নি। প্রশাসনের এমন আচরণে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে ভুল বার্তা যাচ্ছে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।





