কিন্ডারগার্টেনের ভিড়ে ফাঁকা হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়!

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ডানে), কিন্ডারগার্টেন (বামে)
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ডানে), কিন্ডারগার্টেন (বামে) | ছবি: এখন টিভি
0

কুমিল্লার সীমান্তবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি বিদ্যালয়ের পাশের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনগুলোতে উপচেপড়া ভিড়। সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কেন অভিভাবকদের পছন্দ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?

ভারত সীমান্তঘেঁষা কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার রামধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একসময় কোমলমতি শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকত এই বিদ্যালয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা বিদ্যালয়টিতে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। শিক্ষার্থী সংকটে হতাশ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণের রামধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শামসুন নাহার বলেন, ‘করোনার মহামারির দীর্ঘ ছুটির পর থেকে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভর্তির হার খুবই কম। সেই ধারাবাহিকতায় রামধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভর্তির হার এই জরিপ অনুযায়ী আমাদের ভর্তির হারটা খুবই নগণ্য।’

আরও পড়ুন:

সরকারি শিশু জরিপ বলছে, বিদ্যালয়টির ক্যাচমেন্ট এলাকার পাঁচটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি যোগ্য ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩২০ জন। অথচ এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মাত্র ৬৯ জন। অথচ পাশের কয়েকটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের শ্রেণিকক্ষে গিজগিজ করছে শিক্ষার্থী। একটি কিন্ডারগার্টেনেই পড়ছে দুই শতাধিক শিশু।

কিন্ডারগার্টেন কর্তৃপক্ষের একজন বলেন, ‘প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায় করার আমরা চেষ্টা করি। সাপ্তাহিক পরীক্ষা নেয়ার চেষ্টা করি, মাসিক পরীক্ষা নেয়ার চেষ্টা করি এবং সারা বছরই বিভিন্ন মূল্যায়নের মাধ্যমে আবার খাতাগুলো ভালোভাবে মূল্যায়ন করে অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে আমরা সেগুলো দেই। এভাবে আমাদের অভিভাবকদের আস্থাকে ধরে রেখেছি।’

আরও পড়ুন:

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু রামধনপুর নয়—কুমিল্লার সীমান্তবর্তী পাঁচ উপজেলার অন্তত ৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই চিত্র। অধিকাংশ বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম।

অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আন্তরিকতার ঘাটতি, নিয়মিত পাঠদানের অভাব, ইংরেজি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে তারা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করাতে বাধ্য হচ্ছেন।

অভিভাবকদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা যেভাবে পড়ে আসছি এখন প্রাইমারির কোয়ালিটি সেরকম না, যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়া হোক না কেন। কিন্তু কিন্ডারগার্টেনে বাচ্চাদেরকে এত এত বেশি ফেসিলিটিস দেয়া হয় মানে একটা বাচ্চা আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারে।’

আরও পড়ুন:

অন্য একজন বলেন, ‘কিন্ডারগার্টেনে দেয়ার কারণ হচ্ছে, এখানে শিক্ষকরা গুণগত মানগতভাবে সবচেয়ে ভালো দেয়ার চেষ্টা করে। অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং সুন্দর একটা ভাবের একটা আদান-প্রদান হয়।’

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষাই একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। তাই সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

শিক্ষাবিদ ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘লেখাপড়া করে কি হবে? কারণ প্রয়োজন হলো ইনকাম করা এবং এই যে বাচ্চাদেরকে লালন-পালন করাও অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে যায়। এগুলো একটা কারণ অবশ্যই। তবে সেখানে কিন্তু শিক্ষকরা ভূমিকা রাখলে আমার মনে হয় এই সমস্যাটা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো অনেকাংশেই।’

আরও পড়ুন:

সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এরইমধ্যে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থী সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা কর্মকর্তাদের।

কুমিল্লার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, ‘যদি স্কুলে আনন্দদায়ক পরিবেশ যদি একদম শিক্ষক তৈরি করতে না পারে, পড়াশোনাকে যদি ক্লাসে যদি সহজতর করতে না পারে মানে সহজবোধ্য করতে না পারে সোজা কথা, তখন শিক্ষার্থীদের কাছে সবকিছু বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

দুই দশকের ব্যবধানে দেশে মানুষের জীবনমানে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন, যার ছোঁয়া লেগেছে চাহিদা ও রুচিতেও। তাই মৌলিক অধিকারের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে সন্তানের মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতেও অনেক বেশি সচেতন অভিভাবকরা। পরিবর্তিত এ চাহিদা মেটাতে প্রাথমিক শিক্ষায় আধুনিকায়ন চান মানুষ।

এসএস