প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রে নতুন কর; বাড়ছে আলোচনা-সমালোচনা

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর | ছবি : সংগৃহীত
0

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করেছে সরকার। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত হতে পারে সরকারের জন্য আত্মঘাতী। যদিও ব্যাংকে আমানত বাড়াতে এটি সরকারের একটি কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

সাধারণ মানুষের কাছে বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। যার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে প্রতি বছর বিপুল অংকের অর্থ সংগ্রহ করে সরকার।

সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে সরকার এ খাত থেকে সংগ্রহ করেছে ৭৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকারও বেশি। এরমধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে ৬০ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র ব্যুরোর মাধ্যমে ৭ হাজার ২০৬ কোটি ২৮ লাখ আর ডাকঘরের মাধ্যমে সরকার সংগ্রহ করেছে প্রায় ৮ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নেয়ার চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকা সংগ্রহের বিপরীতে ১ লাখ ১৬ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। অর্থাৎ, এ খাত থেকে ঋণ নেয়ার চেয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪২৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা বেশি।

সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে যখন সাধারণ মানুষের ভাঙ্গার প্রবণতা বাড়ছে ঠিক সে সময়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। হঠাৎ কেন এমন সিদ্ধান্ত? কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট কাটাতে এটি সরকারের একটি কৌশল।

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘সরকার হয়তো চেয়েছে যে যারা সঞ্চয় আছে সঞ্চয়টা ব্যাংকে বেশি যাক। কারণ ব্যাংকে যদি সরকার যায়, ব্যাংকের আমানত যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান ক্ষমতাটা বাড়বে এবং তখন ঋণ প্রদান ক্ষমতা বাড়লে, যেটা হবে তখন সরকার যেমন যদি বেশি ঋণ গ্রহণ করে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহটা আরও বেশি হবে। কারণ ঋণ প্রদানের ক্ষমতা যদি সামগ্রিকভাবে ব্যাংক ব্যবস্থার বৃদ্ধি পায়, তখন ঋণ দেয়ার পরিমাণটা বাড়বে।’

তবে মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে এমন সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর আদায় বাড়ালে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে এবং নিম্নমুখী হবে জীবনযাত্রার মান।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রে যে ধরনের সিদ্ধান্ত সরকার নিতে যাচ্ছে, সেটা যে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত সেটা বলা যাবে না। একদিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাপিটাল মার্কেট, অন্যদিকে যে ব্যাংকগুলোও কিন্তু দুর্বল অবস্থাতে আছে এবং কোন ব্যাংকের কখন কি হয়, টাকাটা ঠিকমতো সময়ে তুলতে পারবে কি না মানুষ—এগুলো নিয়ে অনেক টেনশনের মধ্যে থাকে। সঞ্চয়পত্র আসলে আমাদের আরও দীর্ঘ সময় এটা নিয়ে চলতে হবে এবং এটা আসলে সমাজের মানুষের, মানে একেবারে সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য এটাকে রাখতে হবে। একদিকে এখান থেকে সরকারের জন্য অর্থ আসবে, অন্যদিকে এখানে মানুষরা উপকৃত হবে।’

রাজস্ব বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতকে চাঙা রাখা সরকারের লক্ষ্য হলেও সাধারণ মানুষের স্বার্থ আর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত বাজেটে এই প্রস্তাব বহাল থাকে নাকি সমালোচনার মুখে তা পুনর্বিবেচনা করা হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এফএস