বিশ্বে আস্থা, দেশে স্থবিরতা—কেন এগোচ্ছে না বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট?

এআই ধারা বোঝানো হচ্ছে বন্ড মার্কেট
এআই ধারা বোঝানো হচ্ছে বন্ড মার্কেট | ছবি: এআই ইমেজ জেনারেটর
0

যেকোনো আধুনিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগান ও স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হলো একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট। অথচ বিশ্বে আস্থা অর্জন করলেও দেশে যেন এগোচ্ছে না বন্ডের বাজার। অতিরিক্ত ব্যাংক-নির্ভরতা আর কাঠামোগত সংকটে দেশের আর্থিক খাত কি তবে একমুখী বৃত্তে বন্দি? কেনই বা কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছে না বন্ড মার্কেট?

বিশ্ব মানদণ্ডে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থায় মানি মার্কেট, শেয়ার বাজার ও বন্ড মার্কেট ত্রিমুখী ভারসাম্য বজায় রাখে। তবে বাংলাদেশের চিত্র ঠিক উল্টো। দেশের শিল্পায়ন ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ অর্থায়নই আসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। ফলস্বরূপ, ব্যাংকিং খাতের ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত চাপ, যা জন্ম দিচ্ছে তারল্য সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের।

অর্থনীতির আকারের বিপরীতে বাংলাদেশের বন্ড বাজার এশিয়ার অন্যতম ক্ষুদ্রতম, শতাংশের হিসাবে যা মাত্র ৬ দশমিক ৬। এর বিপরীতে, ভারতের বন্ড বাজার জিডিপির ৬৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ৮০, শ্রীলঙ্কায় ৯৭, এবং মালয়েশিয়া ১২৯ শতাংশ। এছাড়া ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ায় বন্ড মার্কেট বেশ ভালো করছে।

দেশের বন্ড বাজার বড় না হওয়ার মূল সমস্যা হলো—এখানে শুধু বিক্রি করার জন্যই বন্ড ছাড়া হয়। এ কারণে বন্ড কেনাবেচার কোনো ভালো বাজার বা পরিবেশ তৈরি হয়নি। এই সমস্যা দূর করতে সরকার বন্ড ফিরিয়ে নেয়ার বা কেনার নিয়ম চালুর চেষ্টা করলেও, সাধারণ মানুষ ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে না আসায় সেই উদ্যোগেও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে স্বল্প মেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে সেই টাকাই আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। ফলে ঝুঁকিতে পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাত।

আরও পড়ুন

বিআইবিএম’র মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেটের কাজ ক্যাপিটাল মার্কেটকে দিতে হবে। আর বন্ড মার্কেটের কাজ বন্ড মার্কেটকে দিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে উন্নয়নমুখী কাজ করে কোনো লাভ হবে না। এতে ব্যাংকখাতই চাপের মুখে পরবে।’

অবশ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অনাগ্রহের বেশকিছু কারণও রয়েছে। বাংলাদেশে করপোরেট বন্ডের উন্নতি না হওয়ার একাধিক কারণ উঠে এসেছে ২০২৫ সালে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায়। যার মধ্যে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়- ব্যাংক অর্থায়নের আধিপত্য, উচ্চ ইস্যু খরচ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও তদারকির অভাব।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বন্ড ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে নীতিমালাকে ঢেলে সাজাতে যৌথভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন যদি একত্রে বসে কাজ করতে পারি তাহলে বন্ড মার্কেট একটা শক্তিশালি রুপ পাবে।’

এদিকে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র পলিসি পেপারে বলা হয়েছে, সুদের হারের অস্পষ্টতা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘ইল্ড কার্ভ’ না থাকায় করপোরেট বন্ডে আস্থা ফেরানো যাচ্ছে না।

দেশের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুইটি ফান্ড ও বিমা কোম্পানিগুলোর তহবিলকে বাধ্যতামূলকভাবে বন্ডে যুক্ত করার পাশাপাশি সেকেন্ডারি বাজারকে সাধারণ শেয়ারের মতো সহজ ও করবান্ধব করার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহীদুল জাহীদ বলেন, বন্ডের একটা সমস্যা হলো আমাদের দেশে যে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন তার রুলস রেগুলেশন মানতে হয়, প্রস্পেক্টাস তৈরি করতে হয়, কোম্পানি অডিট করতে হয়, ডিসক্লোজার করতে হয়। এইজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবাই মিলে একটা উদ্যোগ নেয়া দরকার যাতে বন্ড মার্কেট থেকে করপোরেট লংটার্ম ফাইনান্স করতে পারে।’

বন্ড মার্কেটের এই অচলাবস্থা কাটানো এখন সময়ের দাবি। ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষিত রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে আলোর মুখ দেখবে বন্ড, এমনটিই মত বিশেষজ্ঞদের।

জেআর