করপোরেট দুনিয়ায় এ দৃশ্যপট নতুন কিছু নয়। এমন পরিস্থিতিতে পড়ার পর যেকোনো কর্মীর মনেই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ‘বস কেন এমন করছেন? আমার ওপর কি উনার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ আছে?’
বাস্তবতা হলো, কর্মক্ষেত্রে বসের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পেছনে বেশির ভাগ সময়ই কোনো ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ থাকে না। এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট। করপোরেট ও মনস্তত্ত্বের ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে ‘সুজি সিনড্রোম’।
আরও পড়ুন
যখন কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের সমস্ত শূন্যতা ও একাকীত্ব কেবল অফিসের কাজের মাধ্যমে পূরণ করতে চান এবং নিজের সেই ‘ওয়ার্কহোলিক’ বা ‘কাজপাগল মানসিকতা’ বাকি সহকর্মীদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেন, তখনই এই আচরণগত সমস্যার সৃষ্টি হয়।
কেন এই ‘সুজি সিনড্রোম’
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এমন আচরণের পেছনে মূলত তিনটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে।
চাকরিটাই যখন একমাত্র পরিচয়: কিছু মানুষের জীবনের বৃত্তটা বড্ড ছোট। কাজের বাইরে তাদের ভালোবাসার মতো কোনো শখ, বন্ধু বা প্রাণবন্ত পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠে না। ফলে, তাদের পুরো অস্তিত্বটাই আবর্তিত হয় অফিসকে কেন্দ্র করে। তারা ভাবেন, ‘আমি যেহেতু রাত দিন অফিসে পড়ে আছি, বাকিদেরও তাই করা উচিত।’
আরও পড়ুন
ক্ষমতা চর্চার একমাত্র চারণভূমি: ঘর বা সমাজের অন্য কোথাও যখন কথা শোনার বা মূল্যায়ন করার কেউ থাকে না, তখন অফিসই হয়ে ওঠে একমাত্র জায়গা, যেখানে পদের জোরে মানুষকে বাধ্য করা যায়। এ ধরনের মানুষেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা জাহির করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মিটিং করতে ভালোবাসেন।
হতাশার প্রজেকশন: নিজের ব্যক্তিগত জীবনের একাকীত্ব, ব্যর্থতা বা পারিবারিক অশান্তি তারা অবচেতনভাবেই অফিসে বয়ে নিয়ে আসেন। নিজের ভেতরের সেই অস্থিরতা অধীনস্থদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তারা এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি বা সান্ত্বনা খোঁজেন।
লাভ-ক্ষতি কতটা?
বসের এমন ‘নিয়ন্ত্রণকামী আচরণ’ সাময়িকভাবে কিছু ভালো ফল দিচ্ছে মনে হলেও; দীর্ঘমেয়াদে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। ছুটির দিনেও কাজের চাপ এবং অহেতুক লম্বা মিটিংয়ের কারণে কর্মীরা দ্রুত মানসিক ও শারীরিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন। যেখানে প্রতিটা পদক্ষেপে বসের কড়া নজরদারি বা ‘মাইক্রোম্যানেজমেন্ট’ থাকে; সেখানে কর্মীরা নতুন কিছু ভাবার বা স্বাধীনভাবে কাজ করার সাহস পান না। করপোরেট জগতে একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘মানুষ সাধারণত প্রতিষ্ঠান ছাড়ে না, ছাড়ে খারাপ বস।’ অতিরিক্ত টক্সিক পরিবেশের কারণে একসময় দক্ষ কর্মীরা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, যা প্রতিষ্ঠানের বড় ক্ষতি। বসের ভয়ে কর্মীরা হয়তো সাময়িকভাবে দ্রুত কাজ জমা দেন। তবে ভয়ের মুখে পড়ে করা কাজের গুণগত মান কখনোই টেকসই বা মানসম্মত হয় না।
সমাধান কী?
টক্সিক বা বিষাক্ত কর্মপরিবেশ মুখ বুজে সহ্য করা কোনো কাজের কথা নয়। তবে বাস্তবতার খাতিরে চট করে চাকরি ছেড়ে দেয়াও সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।
সীমানা নির্ধারণ ও ডকুমেন্টেশন: কাজের অতিরিক্ত চাপ বা অফ-টাইমে কাজের নির্দেশ এলে মার্জিতভাবে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা জানান। প্রতিটি অন্যায্য ঘটনার প্রমাণ বা ইমেইল ব্যাকআপ (ডকুমেন্ট) নিজের কাছে রাখা জরুরি।
ব্যক্তিগতভাবে না নেয়া: সবচেয়ে বড় দাওয়াই হলো নিজের মনস্তত্ত্বকে শান্ত রাখা। যখনই বস অহেতুক চিল্লাচিল্লি বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন, তখন নিজেকে মনে করিয়ে দিন, ‘সমস্যাটা আমাকে নিয়ে নয়, সমস্যাটা উনার নিজের জীবনের অপূর্ণতা নিয়ে।’
আরও পড়ুন
করপোরেট লাইফে বসের আচরণকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখে যদি একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়; তবে নিজের ওপর মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। দিনশেষে ‘অফিস আপনার রুটি-রুজির জায়গা হতে পারে, কিন্তু আপনার পুরো জীবন নয়’— এ সত্যটি বসের পাশাপাশি কর্মীদেরও মনে রাখা জরুরি।





