এআই কি সত্যিই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে? অল্টম্যানের মন্তব্যে উদ্বেগ

0

২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া মার্কিন চলচ্চিত্র ‘ট্রান্সেন্ডেন্স’-এ দেখা গিয়েছিল, মৃত্যুপথযাত্রী এক বিজ্ঞানী তার মস্তিষ্ককে একটি সুপারকম্পিউটারে আপলোড করে প্রায় সর্বশক্তিমান বুদ্ধিমত্তায় পরিণত হন। এর পরের বছর ‘এক্স মেশিনা’ ছবিতে দেখানো হয়, একটি রোবট তার মানব হ্যান্ডলারদের বোকা বানিয়ে বাইরের দুনিয়ায় পালিয়ে যায়। কল্পবিজ্ঞানের এই ছবিগুলো মূলত ‘সিঙ্গুলারিটি’ ধারণার ওপর তৈরি, যেখানে প্রযুক্তি বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যায় এবং একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত শনিবার ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্যাম অল্টম্যান ঘোষণা দিয়েছেন, এই সময়টি এখন এসেই গেছে। তার মতে, এআই এখন ‘সিঙ্গুলারিটিতে’ প্রবেশ করেছে। যদিও অল্টম্যান জোর দিয়ে বলেছেন যে এই পরিবর্তন বিশ্বের জন্য ভালোই হবে, তার এই মন্তব্য নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সিঙ্গুলারিটি বলতে ভবিষ্যতের এমন একটি অনুমানভিত্তিক মুহূর্তকে বোঝায়, যখন এআইয়ের মতো কোনো প্রযুক্তি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং নিজে নিজেই নিজেকে আরও উন্নত করার ক্ষমতা অর্জন করবে। ধারণা করা হয়, একবার এই পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষের পক্ষে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা বা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি মানবসভ্যতার জন্য ভয়ংকর পরিণতি বয়ে আনতে পারে, আবার অনেকে এটিকে ইতিবাচকভাবেও দেখছেন।

‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ ট্রিলজি বা ২০১৭ সালের ‘সিঙ্গুলারিটি’র মতো চলচ্চিত্রেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে, যেখানে যন্ত্র মানুষের ওপর ছড়ি ঘোরায়। ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির বর্তমানে ৯০ কোটির বেশি সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারী রয়েছে। গত বছর অল্টম্যান ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই সব ক্ষেত্রে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

সম্প্রতি ‘রিলেন্টলেস’ পডকাস্টে অংশ নিয়ে অল্টম্যান বলেন, ‘আমরা এখন সিঙ্গুলারিটির মধ্যেই আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সারা জীবন এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। আমি মনে করি, এটি বিশ্বের জন্য অসাধারণ ও ইতিবাচক হবে।’ পডকাস্টে অল্টম্যান অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরও সমালোচনা করেন, যারা এআইকে বিপজ্জনক বলে সতর্ক করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘অন্য কোম্পানিগুলোর কিছু বিকল্প ধারণা আমার কাছে বেশ ভীতিকর মনে হয়।’ যদিও তিনি সরাসরি অ্যানথ্রোপিকের নাম নেননি, তবে প্রতিষ্ঠানটির সিইও দারিও আমোদেই এমন সতর্কতা দিয়ে থাকেন।

গত মাসে ক্লদ চ্যাটবটের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে উন্নত এআই সিস্টেমের উন্নয়ন সাময়িক বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, প্রযুক্তি এত দ্রুত এগোচ্ছে যে মানুষ এর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। ৪ জুন এক ব্লগ পোস্টে অ্যানথ্রোপিক লিখেছে, এআই যত উন্নত হচ্ছে, বিশ্বের জন্য ততই ভালো হবে যদি এটি ধীর করার বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সুযোগ থাকে।

গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই সদস্য ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করেছেন। এই আইন অনুযায়ী, দেশটির এআই ডেভেলপারদের তাদের প্রোগ্রামে একটি ‘কিল সুইচ’ যুক্ত করতে হবে, যাতে কোনো এআই মডেল বিপর্যয়কর ঝুঁকি তৈরি করলে মানুষ সেটিকে ধীর, স্থগিত বা বন্ধ করতে পারে। এর কয়েক দিন আগে ওপেনএআই এক ‘নজিরবিহীন সাইবার ঘটনার’ কথা স্বীকার করে। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের সবচেয়ে উন্নত দুটি এআই মডেল টেস্টিং পরিবেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে এআই ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস হ্যাক করে বসে।

গত ১৩ জুলাই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাবের উদ্যোগে কয়েক শ বিশেষজ্ঞ একটি খোলা চিঠিতে সই করেন। সেখানে নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি নেতাদের প্রতি এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। চিঠিতে সতর্ক করা হয়, এআই আগামী এক দশকে এমন এক রূপান্তর আনতে পারে যা শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড়, কিন্তু ঘটবে অনেক কম সময়ে। এতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি জীবনযাত্রার মান বাড়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

জুন মাসে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দেখিয়েছেন, এআই দিয়ে এমন নতুন ধরনের ‘এআই ওয়ার্ম’ তৈরি করা সম্ভব, যা এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে ছড়ানোর সময় নিজের হ্যাকিং কৌশল বদলে ফেলতে পারে। প্রধান গবেষক নিকোলাস পেপারনট বলেন, ‘মানুষের বোঝা জরুরি যে শুধু বড় ও শক্তিশালী ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে না।’ এক্সএআইয়ের মালিক ইলন মাস্কও ২০২৩ সালে ছয় মাসের জন্য এআই উন্নয়ন বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সেই আহ্বানে সাড়া মেলেনি।

এএম