হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন শর্ত ইরানের

হরমুজ প্রণালীর কাছে উপসাগরে একটি পণ্যবাহী জাহাজ
হরমুজ প্রণালীর কাছে উপসাগরে একটি পণ্যবাহী জাহাজ | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শুরু করা যুদ্ধ বন্ধে ইরান যে শর্তগুলোর তালিকা দিয়েছে, তাতে এবার নতুন একটি দাবি যোগ হয়েছে—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি। এ সপ্তাহে এক ইরানি কর্মকর্তা যুদ্ধ থামানোর দাবি-দাওয়ার কথা বলার সময় এই বিষয়টি উল্লেখ করেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সাধারণত এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সিএনএন বলছে, হরমুজ প্রণালি এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে। তেহরান এটিকে সম্ভাব্যভাবে বছরে বিলিয়ন ডলারের রাজস্বের উৎস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরির হাতিয়ার—দুইভাবেই ব্যবহার করতে চাইছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হামলার ক্ষেত্রে প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে এলেও খুব কম মানুষই ভেবেছিল তারা তা বাস্তবায়ন করবে বা বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহে তা এতটা কার্যকরভাবে বিঘ্ন ঘটাবে। ইরানি হামলার মধ্যে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থেমে গেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে এবং পারস্য উপসাগরের বাইরেও বহু দেশ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান ডিনা এসফানদিয়ারি বলেন, ‘ইরান কিছুটা অবাক হয়েছে হরমুজের কৌশলটি কতটা সফল হয়েছে—কত কম খরচে ও তুলনামূলকভাবে কত সহজে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করা যায়।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের একটি শিক্ষা হলো—ইরান এ নতুন চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা পেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা ব্যবহার করতে পারে; আর এটিকে অর্থায়ন করা সেই সক্ষমতা আবিষ্কারেরই অংশ।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এই ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। জি-৭ বৈঠক শেষে ফ্রান্সে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘যুদ্ধের পর তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে—হরমুজ প্রণালিতে টোল ব্যবস্থা চালুর ইরানি চেষ্টা।’ রুবিও বলেন, ‘এটি শুধু বেআইনি নয়, অগ্রহণযোগ্যও; এটি বিপজ্জনক।’ জি-৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ‘নিরাপদ ও টোলমুক্ত’ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

আরও পড়ুন:

হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের ইঙ্গিত হিসেবে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মুজতাবা খামেনির প্রথম ভাষণে বলা হয়, ‘জলপথটি বন্ধের মাধ্যমে যে চাপ তৈরি করা যায়, তা অবশ্যই ব্যবহার করে অব্যাহত রাখতে হবে।’

আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার স্বীকৃতির দাবি তুললেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা ছিল না। এবার ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে, এ চাপকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়া হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানি আইনপ্রণেতারা এমন একটি বিল বিবেচনা করছেন, যাতে প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহারকারী দেশগুলোকে টোল দিতে হবে। এছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন শাসনব্যবস্থার কথাও বলেছেন। এতে তেহরান প্রতিপক্ষের ওপর সামুদ্রিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি ব্যবহারের বিষয়টি ভূরাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনবিষয়ক অধ্যাপক জেমস ক্রাসকা বলেন, ‘ট্রানজিট ফি আরোপ করা ট্রানজিট প্যাসেজের নিয়মের লঙ্ঘন।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক প্রণালিতে উপকূলীয় রাষ্ট্রের ফি আরোপের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের প্রণালি, যেখানে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা একে অপরকে আচ্ছাদিত করে; এসব জলসীমায় ইরানি ও ওমানি আইন প্রযোজ্য। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালি হওয়ায় সব রাষ্ট্রের জন্য ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার প্রযোজ্য, যার ফলে বাধাহীনভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ, আকাশপথ এবং ডুবোজাহাজ চলাচল অনুমোদিত।’

এই নিয়মগুলো জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশনে (ইউএনসিএলওএস) উল্লেখ আছে। যদিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—কোনো দেশই কনভেনশনের পক্ষ নয়, ক্রাসকা বলেন, ‘এর অনেক মূলনীতি প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হওয়ায় তা প্রযোজ্য থাকে।’ তবে ইরান সদস্য না হওয়ার বিষয়টি নিজেদের যুক্তির পক্ষে ব্যবহার করতে চাইতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে যাতায়াতে সফলভাবে টোল আদায়ের দৃষ্টান্ত খুব কম। ১৯ শতকে ডেনমার্ক ড্যানিশ স্ট্রেইটস দিয়ে যাতায়াতে ফি আরোপ করেছিল। তবে একাধিক রাষ্ট্রের প্রতিবাদের পর ১৮৫৭ সালের কোপেনহেগেন কনভেনশনে ‘সাউন্ড ডিউস’ স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হয়।

এএম