প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন দুই ক্রু সদস্যের অবস্থা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। সিএনএন জানিয়েছে, তাদের একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অপরজনের সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি।
এর পর খবর আসে, গতকাল (শুক্রবার, ৩ এপ্রিল) ইরান দ্বিতীয় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানেও আঘাত হানে। এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, পাইলট বিমানটিকে ইরানের ভূখণ্ডের বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হন, এরপর তিনি বিমান থেকে বেরিয়ে আসেন এবং পরে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এ দুই ঘটনায় ইরান সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে গেছে, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি সীমিতই ছিল এবং এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়নি। তবে এ সংঘাতে সামরিক আধিপত্যই যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শক্তি, সেখানে এ ঘটনা অসম যুদ্ধের ঝুঁকি সামনে এনেছে। আর এ যুদ্ধের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ আগে থেকেই মেনে নিতে চাইছে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ ঘটনাগুলো ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং গত এক মাসে গড়ে তোলা ‘অভেদ্যতা’র আবরণও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই দাবিগুলো আগেও একাধিক ক্ষেত্রে খণ্ডিত হয়েছে। তবে এ ঘটনা তারই স্পষ্ট উদাহরণ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের আকাশে প্রায় অবাধ চলাচল ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের। তারা তেহরানকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার কোনো সক্ষমতাই নেই।
গত ৪ মার্চ এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেছিলেন, ‘এমন আধিপত্য খুব শিগগিরই প্রতিষ্ঠিত হবে। গত রাত থেকে শুরু হয়েছে, আর কয়েক দিনের মধ্যে, এক সপ্তাহের কম সময়ে এটি শেষ হবে। বিশ্বের দুই শক্তিশালী বিমানবাহিনী ইরানের আকাশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে।’
তিনি একে সে সময় ‘বিতর্কমুক্ত আকাশসীমা’ বলেও উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আর ইরান এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না।’
ট্রাম্পও গত দুই সপ্তাহ ধরে এ আকাশ আধিপত্যের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। তিনি গত ২৪ মার্চ বলেছিলেন, ‘আমাদের বিমান বাস্তবেই তেহরান ও তাদের দেশের অন্যান্য অংশের ওপর দিয়ে উড়ছে; তারা কিছুই করতে পারছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাইলে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা করতে পারে, আর তারা কিছুই করতে পারবে না।’
প্রেসিডেন্ট কয়েক সপ্তাহ ধরে বলে আসছেন, ‘ইরানের নৌবাহিনী নেই, সেনাবাহিনী নেই, বিমানবাহিনী নেই এবং বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা নেই।’ বুধবার রাতে হোয়াইট হাউসে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন,‘ইরানের তেল স্থাপনায় আঘাত হানলে, তারা কিছুই করতে পারবে না।’
ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কোনো বিমানবিধ্বংসী সরঞ্জাম নেই। তাদের রাডার ১০০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা সামরিক শক্তি হিসেবে অপ্রতিরোধ্য। আবারও বলছি, এটি হাজারো বিমানের মধ্যে মাত্র দুটি ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। প্রশাসন মাঝেমধ্যেই বলেছে, কিছু ব্যর্থতা, এমনকি প্রাণহানিও হতে পারে।’ গত ৪ মার্চের একই ব্রিফিংয়ে হেগসেথও স্বীকার করেন, ‘কিছু ড্রোন ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে বা মর্মান্তিক কিছু ঘটতে পারে।’
তবে আকাশে সামরিক আধিপত্য নিয়ে প্রশাসনের দাবি ছিল একেবারেই চূড়ান্ত ধরনের; ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘বিতর্কমুক্ত আকাশসীমা’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি ইরানের পক্ষে পাল্টা জবাব দেয়ার মতো অস্ত্রও নেই—এমন কথাও বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের সামরিক সাফল্য অতিরঞ্জিত করার সবশেষ উদাহরণ। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং তা আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু প্রাথমিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে তা দেখা যায়নি। আর ঠিক ৯ মাস পর প্রশাসন আবারও ইরানকে আসন্ন পারমাণবিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ট্রাম্প মিথ্যা দাবি করেন, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার জন্য ইরান দায়ী। পরে প্রাথমিক তদন্ত ও অন্য প্রমাণে জানা যায়, সেটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আর মাত্র এক দিন আগেই সিএনএন জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র ধ্বংসের বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি অনেকটাই বাড়িয়ে বলা হয়েছিল এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এখনো তাদের সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ধরে রেখেছে।
এর রাজনৈতিক সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাফল্যই এই প্রশাসনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। কিন্তু মার্কিন জনগণের এই অভিযানের প্রতি খুব কম আস্থা রয়েছে। তাদের মনে হচ্ছে, বিষয়টি যথেষ্ট ব্যাখ্যা করা হয়নি।
সবকিছুর মধ্যেও বিশেষ করে হেগসেথ বলেছেন, সংবাদমাধ্যম সামরিক সাফল্যের দিকটি যথাযথভাবে তুলে ধরেনি। ৪ মার্চের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘এইটাই হলো ভুয়া সংবাদ। স্থলসেনা না নামিয়েই আমরা ইরানের আকাশসীমা ও জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি।’
এক মাস পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখনো একটি বড় ব্যতিক্রম। আর ইরানের আকাশসীমা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কর্মসূচির পতন এখনো ততটা সম্পূর্ণ মনে হচ্ছে না, যতটা দাবি করা হয়েছিল।





