ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি: যেসব শর্ত নিয়ে বড় মতপার্থক্য

তেহরানের এনকেলাব স্কোয়ারে যুদ্ধবিরাম ঘোষণার পর ইরানিরা রাস্তায় নেমে এসেছেন
তেহরানের এনকেলাব স্কোয়ারে যুদ্ধবিরাম ঘোষণার পর ইরানিরা রাস্তায় নেমে এসেছেন | ছবি: সিএনএন
1

মধ্যপ্রাচ্যে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘একটি পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেয়ার যে হুমকি দিয়েছিলেন, তার বেঁধে দেয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টারও কম সময় আগে এই সমঝোতা হয়।

সমালোচকেরা বলেছিলেন, সেই হুমকি বাস্তবায়িত হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আপাতত তা এড়ানো গেছে বলে মনে হলেও দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ফারাক রয়ে গেছে। উভয় পক্ষই এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের জন্য বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। এই যুদ্ধবিরতি মূলত পরবর্তী আলোচনার একটি সূচনা। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে কী কী শর্ত থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওই চুক্তিই মূলত মধ্যপ্রাচ্যকে নাড়িয়ে দেয়া এবং বৈশ্বিক তেলবাজারে ঐতিহাসিক অস্থিরতা তৈরি করা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কী বলেছে

ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে রাজি হওয়ার শর্তে এই সমঝোতা হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়।

ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধবিরতিটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মধ্যস্থতায় হয়েছে। তার দাবি, ইরান ১০ দফা একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার কার্যকর ভিত্তি হিসেবে দেখছে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, আগামী দুই সপ্তাহে চূড়ান্ত একটি সমঝোতার খসড়া তৈরি করা যাবে।

মঙ্গলবার এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘পূর্ণ ও চূড়ান্ত বিজয়’ বলে বর্ণনা করেন। তবে ইরান চুক্তি ভঙ্গ করলে দেশটির বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের আগের হুমকি বাস্তবায়ন করবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি। শুধু বলেন, ‘দেখতেই হবে।’

পরে মধ্যরাত পেরোনোর কিছুক্ষণ পর ট্রুথ সোশ্যালে আরেক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ‘যানজট’ সামলাতে সহায়তা করবে। তার ভাষায়, ‘বড় অঙ্কের অর্থ আয় হবে।’ সিএনএনকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভাব্য সরাসরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৈঠক হতে পারে ইসলামাবাদে, যেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দুই পক্ষকে প্রতিনিধিদল পাঠাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ইসরাইলও যুদ্ধবিরতির অংশ এবং ইরানের বিরুদ্ধে বোমাবর্ষণও স্থগিত করবে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর। তবে দপ্তরটি বলেছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অংশ নয়। এটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ তিনি বলেছিলেন লেবাননও এতে অন্তর্ভুক্ত। ট্রাম্পের ঘোষণাতেও লেবাননের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আরও পড়ুন:

ইরান কী বলেছে

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হলে ইরানের সামরিক অভিযানও বন্ধ হবে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ইরানের সামরিক বাহিনী সমন্বয় করবে।

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ইরান ও ওমান ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে। ওই অর্থ পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করা হবে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিএনএন ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আরও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ১০ দফা পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করেছে। পরিষদ যুদ্ধবিরতিকে ওয়াশিংটনের ‘স্থায়ী পরাজয়’ বলে বর্ণনা করেছে। ওই বিবৃতিতে ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘শত্রুপক্ষের সামান্যতম ভুলও পূর্ণ শক্তিতে মোকাবিলা করা হবে।’

আরও পড়ুন:

যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো কী

আরাঘচি বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ‘সাধারণ কাঠামো’কে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

১৫ দফা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার পুরো বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার অঙ্গীকার, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, তেহরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর সীমা, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অবসান এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয় থাকতে পারে। আঞ্চলিক দুই সূত্রের বরাতে আলোচনায় ইসরাইলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকারের বিষয়ও আছে।

ইরান এর আগে ১৫ দফা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। সোমবার এক কর্মকর্তা এসব দাবিকে ‘অত্যন্ত বেশি, অবাস্তব ও অযৌক্তিক’ বলে বর্ণনা করেন। অথচ মার্চের শেষ দিকে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তেহরান ‘বেশির ভাগ’ শর্ত মেনে নিয়েছে।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউস ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে কী আছে, তা বিস্তারিত জানায়নি। তবে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ পরিকল্পনার মূল অংশগুলো প্রকাশ করেছে। সিএনএন ইরানি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ওই বিবৃতি পেয়েছে। ইরানের একাধিক রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও তা প্রকাশ করেছে।

প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ইরান ও তার আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীর ওপর হামলা বন্ধ, অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার, ইরানকে ক্ষতিপূরণ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করার কথা রয়েছে। চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক জাতিসংঘ প্রস্তাবের দাবিও এতে আছে।

ফারসি ও ইংরেজি—দুই ভাষায় ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ছড়ানো নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির সংস্করণে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র নীতিগতভাবে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকার মেনে নিতে রাজি হয়েছে। ইরানের ভারতে অবস্থিত দূতাবাসও তাদের যাচাইকৃত এক্স অ্যাকাউন্টে ১০ দফার যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতেও ‘সমৃদ্ধকরণ মেনে নেয়া’র কথা বলা হয়েছে।

সিএনএন এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করেছে। এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম ‘পুরোপুরি নিষ্পত্তি’ করা হবে, নইলে তিনি এ চুক্তিতে রাজি হতেন না।

এএম