মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তার ৮০তম জন্মদিনে অর্থাৎ রোববারই ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, একটি ইলেকট্রনিক সইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসলামাবাদ। এরপর আগামী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।
তবে ট্রাম্পের এই পোস্টের আগেই শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, এটি ‘আগামীকাল হচ্ছে না’, তবে ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে’ হতে পারে। এদিকে রোববার একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, রূপরেখা চুক্তির বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চুক্তির রাজনৈতিক, আইনি ও কারিগরি দিকগুলো এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চুক্তিটি চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রোববার সকালে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে পৌঁছেছেন।
এর আগে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, রূপরেখা চুক্তিতে সই হওয়ার পরপরই বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হরমুজ প্রণালি সবার জন্য ‘উন্মুক্ত’ করে দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রণালিটি খুলে দেয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এরপর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে, যা ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সামরিক ও শিল্প খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধের ফলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের আধিপত্য আরও সুসংহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানিদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চুক্তির দিকে এগোলেও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত এখনো অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর অবরোধ বজায় রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এই পথেই পরিবাহিত হতো। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার ভোরে প্রণালির দিকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির কোনো পক্ষ নয় বলে দাবি করা ইসরাইল শনিবার জানিয়েছে, তারা লেবাননে গত ২৪ ঘণ্টায় হিজবুল্লাহর ৭০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করার সুবিধার্থে লেবাননে সামরিক অভিযান কমানোর মার্কিন দাবির কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধ তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, চুক্তিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকলেও এই খসড়া সমঝোতা প্রমাণ করে যে তার দেশ এই সংঘাত থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
শনিবার রাতে ইরানজুড়ে অনুষ্ঠিত সরকারপন্থি সমাবেশগুলোতে চুক্তির বিরোধিতাকারী কট্টরপন্থিরা উচ্চস্বরে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মাশহাদ শহরের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানান, বিক্ষোভে আব্বাস আরাঘচিকে ইঙ্গিত করে ‘আপসকারীর মৃত্যু হোক’ এবং ‘আপসকারী পদত্যাগ করো, পদত্যাগ করো’ বলে স্লোগান দেয়া হয়।
রয়টার্সের দেখা চুক্তির খসড়া শর্ত অনুযায়ী, প্রণালি খুলে দেয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে রাখা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ছেড়ে দেবে এবং তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। ফার্স নিউজ জানিয়েছে, ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আটকে রাখা সম্পদ অবমুক্ত করা চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তেহরানকে প্রণালিতে সেবা প্রদানের বিনিময়ে শুল্ক আদায় করতে হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে, এটি একটি অন্যতম শর্ত। এটি বিনা শুল্কেও খোলা রাখা যেতে পারে। তারা এমনটি করলে আমরা আমাদের অবরোধ তুলে নেব।’ ওই কর্মকর্তা জানান, এরপর নৌপথটি মাইনমুক্ত করা হবে, যেখানে জি-সেভেন ভুক্ত দেশগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে বাঘাই কোনো বিস্তারিত না জানিয়ে বলেছেন, এই অঞ্চলে বিদেশি সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবসান হতে হবে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ৬০ দিনের আলোচনার মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সমাধান করা হবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে শেষ পর্যন্ত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাদের উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস ও অপসারণ করা হবে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ইরানের অগ্রাধিকার হলো তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে মিশ্রিত বা লঘু করে দেশের ভেতরেই রাখা হোক।





