আরব সাগরে পাকিস্তানি বোয়িং ৭৩৭ বিধ্বস্ত; ৫ ক্রুর সন্ধান অব্যাহত

আরব সাগরে বিধ্বস্ত কেটু এয়ারওয়েজের কার্গো উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ
আরব সাগরে বিধ্বস্ত কেটু এয়ারওয়েজের কার্গো উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ | ছবি: সংগৃহীত
0

করাচি উপকূলে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর একটি কার্গো বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন পাকিস্তানি উদ্ধারকর্মীরা। বুধবার সাগরের গভীরে চালানো এক অভিযানে এই ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়। বিমানটিতে থাকা পাঁচ ক্রুকে খুঁজে বের করতে উদ্ধার অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওরমারা বন্দর থেকে ৫৩ নটিক্যাল মাইল (৯৮ কিলোমিটার) দক্ষিণে কে২ এয়ারওয়েজের বোয়িং ৭৩৭ বিমানটির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, পাকিস্তান নৌবাহিনী ও পাকিস্তান সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করতে ‘বিভিন্ন আকাশ ও সমুদ্রগামী সম্পদ’ মোতায়েন করেছে। ক্রুদের খুঁজে বের করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নেভিগেশন সিস্টেমে সমস্যার কথা জানিয়ে ২৭ বছর পুরোনো এই মালবাহী বিমানটি আরব সাগরে নিখোঁজ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তল্লাশি অভিযান দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিমানটির পরিচালনা প্রতিষ্ঠান কে২ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, ক্রুদের মধ্যে দুজন পাইলট, দুজন প্রকৌশলী ও একজন সহায়তাকারী কর্মী ছিলেন। কর্তৃপক্ষ ক্রুদের অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে শরিফ তাদের পরিবারের প্রতি ‘আন্তরিক সমবেদনা’ জানিয়েছেন।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং পরিষেবা ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, উচ্চতার তীব্র পরিবর্তনের পর খাড়াভাবে নেমে বিমানটি করাচির দক্ষিণ-পশ্চিমে সাগরে বিধ্বস্ত হয়ে থাকতে পারে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সাগরে সমন্বিত তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়েছিল। কে২ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, তারা পাকিস্তান সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করছে। বোয়িং এখনো এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে করাচির উদ্দেশে যাওয়ার সময় পাকিস্তান স্ট্যান্ডার্ড টাইমে রাত ৯টা ১৮ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ১৬টা ১৮ মিনিট) বিমানটি নেভিগেশন সিস্টেমে সমস্যার কথা জানায়।

স্থানীয় এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বিমানটিকে পথনির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে তিন মিনিটের মধ্যেই রাডার সিস্টেমে দেখা যায়, বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিবৃতি অনুযায়ী, ওই সময়ে বিমানটি করাচির প্রায় ১৫৫ নটিক্যাল মাইল (২৮৭ কিলোমিটার) পশ্চিমে ছিল।

ফ্লাইটরাডার২৪-এর ট্র্যাকিং তথ্যের শেষ মুহূর্তগুলো ছিল বিশৃঙ্খল। এতে দেখা গেছে, বিমানটি এক মিনিটের কম সময়ে প্রায় ৫ হাজার ফুট নিচে নেমেছে। এরপর ৩০ সেকেন্ডে প্রায় ৬ হাজার ফুট ওপরে উঠেছে। এরপর সেটি ৩৬ হাজার ৫৫০ ফুট উচ্চতা থেকে ভয়াবহ ডাইভ দিতে শুরু করে। সর্বশেষ প্রেরিত তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ১০০ ফুট উচ্চতায় ছিল। এ সময় এর উল্লম্ব হার ছিল প্রতি মিনিটে বিয়োগ ২২ হাজার ৪০০ ফুট, যা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। নিচের দিকে নামার হারটি ছিল অত্যন্ত খাড়া ও অস্বাভাবিক।

নিখোঁজ বিমানটি বোয়িংয়ের কয়েক দশক পুরোনো ৭৩৭-৪০০ মডেলের। এটি নিরাপত্তা সংকটে পড়া ৭৩৭ ম্যাক্স থেকে দুই প্রজন্ম পুরোনো। এতে জিই অ্যারোস্পেস এবং ফ্রান্সের সাফ্রানের যৌথ মালিকানাধীন সিএফএম ইন্টারন্যাশনালের তৈরি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে।

মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বাণিজ্যিক পাইলট জন কক্স এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য থেকে মনে হচ্ছে অজ্ঞাত কারণে ক্রুরা বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ৭৩৭-৪০০ চালানোর অভিজ্ঞতা থাকা এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটি সম্ভব যে শেষ পর্যায়ে বিমানটি স্টল হয়ে গিয়েছিল এবং খুব, খুব উচ্চ হারে নিচে নামছিল।’

সাধারণত একাধিক কারণেই বিমান দুর্ঘটনা ঘটে এবং তদন্ত শেষ হতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ এই তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে তারা এখনো বিমানটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহনকারী ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা জানায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড জানিয়েছে, তারা তদন্তে পাকিস্তানকে সহায়তা করতে বোয়িং, জিই অ্যারোস্পেস ও ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কারিগরি উপদেষ্টাসহ একজন অনুমোদিত প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে।

ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, কে২ এয়ারওয়েজের এই জেট বিমানটি ১৯৯৯ সালে যাত্রীবাহী বিমান হিসেবে রাশিয়ার অ্যারোফ্লটকে সরবরাহ করা হয়েছিল। ২০১২ সালে এটিকে মালবাহী বিমানে রূপান্তর করা হয়। এটিই কে২ এয়ারওয়েজের একমাত্র বিমান এবং এটি ২০২৪ সালে বাহকটির বহরে যুক্ত হয়। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির সর্বশেষ ফ্লাইট ছিল ২৮ জুন।

এটি ২০২০ সালের পর পাকিস্তানের প্রথম প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা হবে। ২০২০ সালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান করাচির রানওয়ের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে ৯৭ জন নিহত হয়েছিলেন।

এএম