পাল্টাপাল্টি এই হামলার দ্বিতীয় দিনের কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তার নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, ‘ইসলামিক বিপ্লবের শহিদ নেতার মরদেহ ইমাম রেজার মাজারের স্মৃতি সৌধে দাফন করা হয়েছে।’
খামেনির জানাজার শোভাযাত্রা দেশটির পবিত্রতম ধর্মীয় স্থানে পৌঁছালে সেখানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়। অনেকের হাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী ব্যানার ছিল, যেখানে লেখা ছিল, ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব।’ খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মুজতবা খামেনিকে দাফন অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। একই হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ করে আসছেন।
১৭ জুন যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তির আলোচনার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটন যে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল, তার পর এটাই সবচেয়ে বড় হামলা। একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের সঙ্গে সমাধানে পৌঁছাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ‘কারিগরি আলোচনা’ চলমান রয়েছে। তবে এর মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’। উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন, প্রয়োজন হলে তার দেশ আরও বেশি শক্তি নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আবারও শুরু করতে প্রস্তুত।
ইরানের কর্মকর্তারা জানান, বুশেহর প্রদেশে দেশটির একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে হামলা হয়েছে। বুশেহরের উপ-গভর্নর এহসান জাহানিয়ান বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশ, চোগাদাক শহরের একটি সামরিক ঘাঁটি এবং প্রদেশের দক্ষিণের একটি মাছ ধরার জেটিতে হামলা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
হামলার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরানে বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশ করে লেখেন, ‘গতকাল ইরান জাহাজে যে হামলা চালিয়েছে, তারই প্রতিশোধ এটি। আবার এমন হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক স্থাপনায় পরিদর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি ইরানের হুমকি কমাতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলেও পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে দাম আবার কমে আসে। ইরান অভিযোগ করেছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে মাশহাদগামী দুটি সেতুতে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করেছে। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য সেতু দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, বুশেহরসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইরানশাহর শহরের বিমানবন্দরে এক অগ্নিনির্বাপক কর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া বুধবারের হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর নয় সদস্য নিহত হন।
সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উদ্দেশ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার কথা রয়েছে। তবে ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং এখানে কোনো টোল থাকা উচিত নয়। ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোই তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগের কার্যকর উপায়।
ইরানের জ্যেষ্ঠ আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ‘আমেরিকা এখনো শেখেনি যে দাদাগিরি আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কোনো মূল্য নেই। পরিষ্কার করে বলছি, আপনারা হামলা করলে পাল্টা হামলার মুখে পড়বেন।’
এদিকে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারীরা নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরাহমান আল থানি বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার নিন্দা জানান। খামেনির সাত দিনের জানাজা শেষ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার স্থায়ী চুক্তির লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা ছিল।





