জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি গত সেপ্টেম্বর মাসে যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ৮১ শতাংশের বেশি পুনরুদ্ধার হয়েছে। এমনকি ওই মাসের ১৪ দিন তেল রপ্তানির পরিমাণ যুদ্ধের আগের দৈনিক গড়কেও ছাড়িয়ে যায়। তবে এই বৃদ্ধির বিপরীতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ভাড়া, আকাশচুম্বী বিমা ও বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলার চিত্র কেমন?
জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মারিস্কসের হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে অন্তত সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১ অক্টোবর কুয়েতের পতাকাবাহী বিশালাকার ট্যাংকার এমটি কাজিমাহ ৩-এ হামলার পর আগুন ধরে যায়। ৪ অক্টোবর ওমানের জাজিরাত উম্ম আল-ফায়ারিনের কাছে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার লিপসি হামলার শিকার হয়, যাতে এর ইঞ্জিন রুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত ২ অক্টোবরের পর থেকে এডেন উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে প্রায় প্রতিদিন হামলার ঘটনা ঘটছে। এডেন উপসাগরে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি ট্যাংকারকে আটকে দেয় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) নৌসেনারা এবং গতিপথ না বদলালে হামলার হুমকি দেয়। গত মঙ্গলবার পানামার পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন ক্রু আহত হন।
হরমুজ এড়িয়ে কীভাবে তেল বাইরে পাঠানো হচ্ছে?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরাসরি জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। সংকট কাটাতে উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব দুটি মূল কৌশল কাজে লাগাচ্ছে:
১. ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন: সৌদি আরব তার দেশের পূর্ব প্রান্তের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত তেল পাঠাচ্ছে। ফলে হরমুজ প্রণালি ছাড়াই লোহিত সাগর দিয়ে সরাসরি বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে।
২. শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার: ছোট ছোট শাটল জাহাজের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভেতর দিয়ে তেল পার করা হচ্ছে। শনাক্ত হওয়া এড়াতে এসব জাহাজ অনেক সময় ট্র্যাকিং সিস্টেম (ট্রান্সপন্ডার) বন্ধ রাখে। প্রণালি পার হওয়ার পর বাইরে অপেক্ষমাণ বড় বড় ট্যাংকারে সেই তেল তুলে দেওয়া হয়।
বিকল্প এই ব্যবস্থা কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই?
পিভিএম অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের বিশ্লেষক তামাস ভারগা বলেন, ‘বিকল্প এই রুটগুলো যতক্ষণ সুরক্ষিত থাকবে, ততক্ষণ তেল সরবরাহ ধরে রাখা যাবে। তবে সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। ফলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়লে যেকোনো মুহূর্তে এই পথও রুদ্ধ হতে পারে।’
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প মনে করেন, শাটল ব্যবস্থার কারণে বিপুলসংখ্যক জাহাজের প্রয়োজন হচ্ছে, যা পরিবহন খরচ ও জাহাজ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত সপ্তাহে জি-৭ জোট তাদের জরুরি মজুত থেকে ডিজেলসহ ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়।
সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত বৈশ্বিক বাজারে প্রায় ৩০০ কোটি ব্যারেল তেলের ক্ষতি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়ার পরও বিশ্ববাজারের মজুত স্বাভাবিক হতে এবং আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।





