কেবল ভাস্কর দত্তই নয়, ভবানীপুরের স্থানীয় ভোটার লতা কর্মকার বলেন, ‘আমি দিদির লোক। বিয়ে হয়ে এখানে আসার পর থেকে দিদিকেই দেখছি। মমতা ব্যানার্জি অনেক উন্নয়ন করেছে।’
যদিও পরিবর্তনের পক্ষেই সওয়াল করেছেন ৬২ বছর বয়সী ব্যক্তি তরুণ দে। তার অভিমত, ‘৩৪ বছরের বাম সরকারের যদি পরিবর্তন চাই, তবে ১৫ বছরের একটা সরকারের পরিবর্তন চাইতে অসুবিধা কোথায়? এটা তো কোনো অন্যায় নেই। তাছাড়া এই সরকার এখন ১৫০০ রুপি করে ভাতা দিচ্ছে, অথচ এরাই ২০১১ সালে সরকারে আসার পর বিধায়কদের ভাতা ১ লাখ রুপি করেছে। তাদের ভাতা আগে বাড়িয়ে জনগণকে এখন ৫০০ রুপি ভাতা বাড়িয়েছে। এটাতো ধোঁকাবাজি।’
প্রথম দফার নির্বাচন শেষ। এবার শেষ দফার পালা। পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় কে আসবে সেটা নিয়ে যেমন চুল চেরা বিশ্লেষণ চলছে, ঠিক তেমনি রাজ্যের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ আসন ভবানীপুর নিয়েও মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
আরও পড়ুন:
রাত পোহালেই আগামীকাল (বুধবার, ২৯ এপ্রিল) রাজ্যের যে ১৪২ আসনে ভোট নেয়া হবে, তার মধ্যে রয়েছে এই ভবানীপুর আসনটি। এই আসনে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী বর্তমান বিধায়ক ও রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। এছাড়াও এই আসনটিতে নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে আছেন কংগ্রেস প্রার্থী প্রদীপ প্রসাদ, সিপিআইএম প্রার্থী শ্রীজীব বিশ্বাস, আম জনতা উন্নয়ন পার্টির পুনম বেগম।
১৯৫১ সালে ভবানীপুর আসন গঠিত হওয়ার পর ১৯৬২ সালে এই আসনের নাম পরিবর্তন হয়ে দাঁড়ায় কালীঘাট। একটা সময় এই আসনের অস্তিত্ব ছিল না। ২০০৯ সালে পুনরায় ভবানীপুর আসনটি গঠিত হওয়ার পর সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য তৃণমূলের।
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার ক্ষমতায় আসে। সেবার এই ভবানীপুর আসনে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই আসন থেকে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তৃতীয়বার ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনে কিছুটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারই একসময়ের বিশ্বস্ত শুভেন্দু অধিকারীকে পরাস্ত করতে নন্দীগ্রাম আসন থেকে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন তৃণমূল প্রধান।
আরও পড়ুন:
ওই নির্বাচনে গোটা রাজ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় আসে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও সেবার নন্দীগ্রাম আসনে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন মমতা। এরপর ফের ভবানীপুর আসন থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন এবং তৃতীয়বারের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন মমতা। কিন্তু এবার আর ভবানীপুর ছেড়ে বাইরের কোনো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঝুঁকি নেননি মমতা। তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত এই ভবানীপুরেই লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা।
২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষনার আগে এই মমতাকেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে শোনা গিয়েছিল তিনি ফের ভবানীপুর থেকেই প্রার্থী হতে চান এবং এক ভোটে হলেও তিনিই জিতবেন।
ভবানীপুর আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে মমতাকে প্রার্থী করানোর পরপরই এই আসনে মমতাকে ২০ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে তাকে ‘সাবেক মুখ্যমন্ত্রী’ করার চ্যালেঞ্জ জানান এবং এই আসনে প্রার্থী রাজ্যের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এমনকি বিভিন্ন মিটিং-মিছিল-সভা থেকে এই ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জিকে হারানোর কথা বলে বেড়াচ্ছেন শুভেন্দু। স্বাভাবিকভাবেই মমতা-শুভেন্দুর এই পাল্টাপাল্টি মন্তব্যে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে অন্যতম হাই-ভোল্টেজ আসনে পরিণত হয়েছে ভবানীপুর।
গত ২৩ এপ্রিল রাজ্যে প্রথম দফার নির্বাচনের পর থেকেই এই আসনটিতে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন শুভেন্দু। একের পর এক সভা আবার কখনো রোড-শো করে জনসংযোগ করেছেন শুভেন্দু।
আরও পড়ুন:
অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জিও ভবানীপুরের অলিতে গলিতে কখনো পদযাত্রা, কখনো পথসভা করে বেড়িয়েছেন। উভয়েরই ধনুক ভাঙ্গা পণ! অর্থাৎ বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচ্যগ্র মেদিনী (যুদ্ধ ছাড়া সূঁচের ডগায় যতটুকু মাটি ওঠে ততটুকুও কাউকে দেওয়া হবে না)।
ভবানীপুর আসন থেকে নিজেকে জেতানোর আবেদন জানিয়ে ইতোমধ্যেই মমতা বলেছেন, তিনি ৩৬৫ দিনই ভবানীপুরে থাকেন। তার ধর্ম-বর্ণ-কর্ম সবই এই ভবানীপুর থেকেই। তাই ভবানীপুর সহ ২৯৪ টা আসনেই যেন জোড়া ফুলের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করা হয়।
কিন্তু ঘরের মেয়ে মমতা, নাকি বহিরাগত শুভেন্দু? রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে নজরকাড়া আসন ভবানীপুর কাকে বেছে নেবে? ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে ভবানীপুরে? নাকি শুভেন্দুকে হারিয়ে নন্দীগ্রামের হারের প্রতিশোধ নেবেন মমতা? এসবই এখন লাখ রুপির প্রশ্ন।
মমতা না শুভেন্দু— শেষ হাসি কে হাসবে তা স্পষ্ট হবে ৪ মে নির্বাচনের ফলাফলে। কিন্তু তার আগে লড়াইটা যে হাড্ডাহাড্ডি হবে তা এক কথায় স্পষ্ট।
আরও পড়ুন:
ভবানীপুরের বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী মানিক নন্দী জানান, অন্য কেউ দাঁড়ালে হয়তো লড়াই এত শক্ত হতো না কিন্তু শুভেন্দু দা দাঁড়িয়েছেন বলেই ভবানীপুরে লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে। তারপরেও মমতা ব্যানার্জির জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন তিনি। অন্যদিকে রাজ্য থেকে বামফ্রন্ট বা কংগ্রেসের অস্তিত্ব ও ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে বলেও অভিমত তার।
কেবলমাত্র দিদিকে ভোট দেয়ার জন্য দুবাই থেকে বাসায় ফিরে এসেছেন তরুণ যুবক ঝুনঝুন পান্ডে। তিনি জানান ‘আমরা দিদির ভক্ত’।
ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে না চাইলেও ভবানীপুরের ভোটারদের কেউ কেউ আবার মমতা-শুভেন্দুর লড়াইকে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন।
ভবানীপুরে ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তৃণমূলের দাবি, এখানে প্রায় ৫১ হাজারেরও বেশি নাম বাদ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি দাবি করছে, পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকার মাধ্যমে তারা ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে আছে।
সামগ্রিকভাবে, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়ের সমর্থকরাই নিজ নিজ নেতা-নেত্রীর পাল্লা ভারী বলে দাবি করছেন ঠিকই- তবে মমতা ব্যানার্জির জন্য এটি একটি সম্মান রক্ষার লড়াই। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন:
তবে মমতা বা শুভেন্দু নন। ভোট দেবে মানুষ, মানুষই জিতবে- এমনটা অভিমত সর্ণেন্দু সাহার। বলেন, ‘তরতর কারণ আমি কোন রাজনীতির মধ্যে নেই। আমরা সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ।’
বাঙালি হিন্দু, অবাঙালি এবং মুসলিম ভোটারদের মিশ্রণ রয়েছে এই ভবানীপুরে। ফলে অনেকে অনেকেই একে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলেও অভিহিত করে থাকে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুর আসনে মুসলিম ভোট রয়েছে ২৪ শতাংশ। বাকি ৭৬ শতাংশের মধ্যে সম্মিলিত ভাবে রয়েছে শিখ, খ্রিস্টান, হিন্দুদের ভোট। হিন্দুদের মধ্যে আবার মাড়োয়ারি, গুজরাটিদের ভোট বেশ অনেকটাই। বলা ভালো অমুসলিম প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটারদের মধ্যে ৪২ শতাংশ বাংলাভাষী, বাকি ৩৪ শতাংশ অন্য ভাষাভাষী অবাঙালি ভোটার। অবাঙালি এই ভোটারদের মধ্যে আবার বিজেপির প্রভাব অত্যন্ত বেশি।
তরুণ প্রজন্মের ভোটার, আমন হালদার বলেন, ‘যেটা আছে সেটাতেই আমরা খুশি। আর কোন এক্সপেরিমেন্ট চাই না।’
বর্তমানে বেকার যুবকদের দেড় হাজার রুপি ভাতা দিচ্ছে মমতা সরকার। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসলে তার তিন হাজার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
এই নিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য রাজ্যে যে ভাতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল সেটাই এখনো কার্যকরী হয়নি। রাজ্যে কর্মসংস্থান আছে, চাকরি আছে, শিক্ষার দিক থেকেও আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। কিন্তু যারা চাকরি নেই বলছেন তারা হয়তো কম্পিউটারের বই পড়েছেন কিন্তু কম্পিউটার চালাতে পারেন না।’





