আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নাজের উদ্দিন। বিবাদী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইশরাত হাসান ও তানজিলা রহমান জুঁই। তাদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী ইফফাত হাসান শাম্মী।
তারা জানান, দেনমোহর ও খোরপোশ-সংক্রান্ত পারিবারিক আদালতের এক রায়ের বিরুদ্ধে স্বামীর দায়ের করা দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন।
ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন দেওয়ানি রিভিশন মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এমন রায় দিয়েছেন। হাইকোর্টের দেয়া ৩২ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গতকাল (মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকাশিত রায়ের বিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরিয়াহ মোতাবেক ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে তানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের কোলজুড়ে এক কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। এরপর যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক মনোমালিন্যের জেরে ২০১৭ সালে স্ত্রী তানজিদা নাসরিনকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে স্বামী তাকে তালাক প্রদান করেন। তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোশ এবং কন্যাসন্তানের খোরপোশ দাবি করে চট্টগ্রাম পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন স্ত্রী সানজিদা নাসরিন।
ওই মামলার শুনানি শেষে চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী জজের আদালত (পারিবারিক আদালত) ২০২২ সালের ২৫ মে স্ত্রীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি প্রদান করেন। যেখানে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন খোরপোশ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া খোরপোশ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ৬০ দিনের মধ্যে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি, কন্যাসন্তানের বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে (বার্ষিক ১০ শতাংশ বৃদ্ধিসহ) খোরপোশের আদেশ দেয়া হয়।
আরও পড়ুন
সেই একতরফা রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে স্বামী জেলা জজ আদালতে আপিল (পারিবারিক আপিল) দায়ের করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজ (৫ম আদালত) তা খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর স্বামী ইয়াকুব আলী রায়ের বিরুদ্ধে একই বছরে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
হাইকোর্টে স্বামী ইয়াকুব আলীর পক্ষে তার আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, স্বামী ইতোমধ্যে ডিক্রিকৃত টাকার একটি বড় অংশ (৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা) পরিশোধ করেছেন। ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে স্বামীর বর্তমান আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে তিনি অবশিষ্ট বকেয়া টাকা এককালীন পরিশোধ করতে পারবেন। তাই তিনি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বকেয়া দেনমোহর ও খোরপোশ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ প্রার্থনা করেন।
অপরদিকে, স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান রিভিশন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, স্বামী সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী ও কন্যাসন্তানের আইনি অধিকার বিলম্বিত করছেন। অধস্তন আদালতগুলোর দেয়া রায় তথ্যপ্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে যথাযথভাবে দেয়া হয়েছে, ফলে হাইকোর্টের রিভিশন এখতিয়ারে এতে হস্তক্ষেপ করার কোনও সুযোগ নেই।
এরপর দেওয়ানি রিভিশন খারিজ করে ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর অধস্তন আদালতের দেয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রেখে রায় দেন হাইকোর্ট।
আরও পড়ুন
মামলার সার্বিক বিষয়, পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ (সুরা আন-নিসা : ৪, ২০, ২১, ২৪, ২৫; সুরা আল-বাকারা : ২৩৬, ২৩৭) এবং প্রচলিত মুসলিম আইন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আদালত বলেন, এই আদালতের দেনমোহরের কোনও অংশ মওকুফ বা মাফ করার কোনও এখতিয়ার নেই। তবে আইন স্বীকার করে যে স্ত্রী তার স্বামীর অনুকূলে স্বেচ্ছায় তার দেনমোহরের পুরো অংশ বা কিছু অংশ মাফ বা পরিত্যাগ করতে পারেন। এই ধরনের ত্যাগের বা মওকুফের ওপর নির্ভর করতে হলে নিশ্চিত হতে হবে যে তা সচেতনভাবে, সুনির্দিষ্টভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা হয়েছে মর্মে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে। বলপ্রয়োগ, অনুচিত প্রভাব, প্রবঞ্চনা বা মুক্ত সম্মতিকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনও বিষয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথাকথিত মওকুফকে বৈধ মাফ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
আদালত বলেন, উপযুক্ত তথ্যাদি, পরিস্থিতি এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক বিবেচনায় দেখা যায় যে বর্তমান মামলার দেনমোহর কনে ও বরের আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী ধার্য করা হয়নি; তাই লিখিত দেওয়ানি চুক্তির শর্তাবলির বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। খোরপোশের বিষয়ে দেখা যায় যে অধস্তন আদালতগুলো ইদ্দতকালীন খোরপোশ এবং নাবালিকা সন্তানের খোরপোশের বিষয়ে একমত হয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে, একজন স্কুলগামী নাবালিকা সন্তানের অর্থনৈতিক মূল্যস্ফীতি, আবাসন এবং উৎসব পালনের বিষয়টি বিবেচনা করে উক্ত খোরপোশ প্রয়োজন।
এসব আলোচিত কারণসমূহের ভিত্তিতে, অধস্তন আদালতের দেয়া রায় ও ডিক্রিতে এমন কোনও আইনি ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা বা এখতিয়ারগত ভুল আমি খুঁজে পাচ্ছি না; যা এই আদালতের হস্তক্ষেপে পরিবর্তন করা যেতে পারে। ফলে আবেদনকারী আইনজীবীর যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে আমি বাধ্য হচ্ছি। অতএব, রুলটির কোনও সারবত্তা নেই এবং কোনও খরচ ছাড়াই এটি খারিজ করা হলো। সংশ্লিষ্ট অফিসকে অবিলম্বে এই রায় ও আদেশের প্রতিলিপিসহ অধস্তন আদালতের নথি পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হলো।





