কৃষি উন্নয়নে সরকার ৭ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | ছবি: পিএমও
0

কৃষি উন্নয়নে বর্তমান সরকার সময়োপযোগী ৭ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ (বুধবার, ২২ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের সময় টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আলমের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ ৭ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি কৃষি নির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা যেটি সবাই দেখছি আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে বিভিন্ন বিষয়। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ হ্রাস এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা।’

‘এসব কারণে কৃষি খাত বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আমাদেরকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই কৃষি উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিকে টেকশই এবং লাভজনক খাতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে সমগ্র দেশবাসী দেখেছেন আমরা এরই মধ্যে ১৪ এপ্রিল কৃষক কার্ডের কাজ শুরু করেছি, যার প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম নির্বাচনের পূর্বে। আমরা কৃষক কার্ড বিতরণ করেছি।’—যোগ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ১০টি সেবা, যথা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য প্রাপ্তিসহ ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ প্রদান ইত্যাদি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে (প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ) এ কার্ড প্রদান করা হবে।’

আরও পড়ুন:

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম কর্মসূচি ছিলো প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। এসময় কৃষি উন্নয়নে সরকারের ৭ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ

আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষির উন্নয়নে বর্তমান সরকার আরও অনেকগুলো সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সরকার উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রষণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এজন্য এরই মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি সরকার হাতে নিয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ আমরা আগামী পাঁচ বছরে করবো। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ভুর্তুকি প্রদান করে ট্রাক্টর হারভেস্টার রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার পরিকল্পনা বর্তমান সরকারে হয়েছে।’

‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু

তারেক রহমান বলেন, ‘পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য “ক্রপ জোনিং” পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। ফলে জমির অপচয় কমে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে পতিত জমি চিহ্নিত করে সেগুলো আবাদের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পতিত জমি কৃষির আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিসহ চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

কৃষি পণ্যের বহুমুখীকরণ

কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক সময় ধান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা, ফুল চাষ খাতে সম্প্রসারণ করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’

কৃষকদের প্রণোদনা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ভুর্তকি প্রদান

তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি প্রদান করা হবে। তাছাড়া কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদের কৃষিঋণ এবং ফসল বীমা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্যও বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের কল্যাণে প্রতি অর্থবছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের “কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা” খাতে অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা হয়।’

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ

প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ৭ শত কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ বরাদ্দ হতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ বাবদ ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এতে ২৫ লাখ ২২ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন।

আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ, এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষিপণ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো-মেশিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’

উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন

তিনি বলেন, ‘কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।’ এসময় কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারের কার্যক্রমও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন:

এরপর টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আউয়াল একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির একটি পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে। মাননীয় স্পিকার আপনি জানেন যে, বিভিন্ন কেমিক্যাল সার ব্যবহার করার ফলে আমাদের অনেক জায়গায় মাটির উর্বরতা কমে গিয়েছে এবং সেজন্য মাটির বিভিন্ন বিষয় টেস্ট করার মাধ্যমে আমরা ন্যানো সারের প্রয়োগ বৃদ্ধি করতে চাচ্ছি দেশে। প্রচলনটা তৈরি করতে চাচ্ছি যাতে করে সারের খরচও কমে এবং মাটির যে উর্বরতা শক্তি সেটি নষ্ট না হয়।’

‘একইসঙ্গে আরেকটি বিষয় আছে, বিভিন্ন জায়গায় মাটির যে উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়, চুনের ব্যবহার করার মাধ্যমে মাটির সেই উর্বতা বৃদ্ধি করা সম্ভব, রাসায়নিক যে ক্রিয়াটি থাকে সেটিকে নিউট্রালাইজ করা সম্ভব— সেই উদ্যোগও গ্রহণ করছে।’—যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়া নেত্রকোণা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছি যে প্রান্তিক কৃষক যারা আছেন তাদের আমরা এই কৃষক কার্ড সহায়তার মধ্যে নিয়ে এসেছি এবং প্রান্তিক কৃষক বা একদম ক্ষুদ্র কৃষক যারা আছেন, তাদের সহায়তা যেটা আমরা দিচ্ছি, সেটার ভেতর দিয়েই আমরা কৃষি শ্রমিক যারা আছে তাদের সহায়তা পৌঁছে দিতে চেষ্টা করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাদের যেই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা করছি, সেখান থেকেই একদম শ্রমিক যারা আছেন, তারাও সেই সহযোগিতার অংশীদার হবেন।’

এসএইচ