ভোট গ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করে ফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আগামীকাল (শুক্রবার, ২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল (বুধবার, ১৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ব্রিফিংয়ে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এবারের নির্বাচন ‘‘ঐতিহাসিক’’।’ তার ভাষায়, ‘মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একজন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং দীর্ঘ সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এই নির্বাচনকে ঘিরে সবার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’
সিইসি বলেন, ‘১৯৯১ সালের পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়নি। দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’
আজ ভোট, ভোটার ৩৪৯ এমপি
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সংসদ কক্ষে ভোট গ্রহণ হবে। ভোট শেষে সেখানেই গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে। পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নামে গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।
সংরক্ষিত নারী আসনসহ জাতীয় সংসদের মোট সদস্যসংখ্যা ৩৫০। তবে বিএনপির সংসদ সদস্য আসলাম চৌধুরীর সদস্যপদ আদালতের রায়ে বাতিল হওয়ায় এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোট দেয়ার পদ্ধতিও জানিয়েছেন ইসি সচিব। ভোটাররা ব্যালট গ্রহণের পর নির্ধারিত স্থানে প্রার্থীর নামের পাশে স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন। এরপর ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হবে। বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হলে গণনা শুরু হবে।
ইসি জানিয়েছে, ভোটের ব্যালট সাদা কাগজে কালো কালিতে ছাপানো হয়েছে।
ভোটের সরাসরি সম্প্রচার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভোট শুরু হওয়ার ২০ মিনিট আগে থেকে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং দুই প্রার্থীর ভোট দেয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। একইভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে।
এদিকে, গতকাল (বুধবার) জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভা শেষে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, দলীয় সংসদ সদস্যদের ভোট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।’ সরকার ও বিরোধীদল মিলেই গণতন্ত্রকে আরও স্থায়ী রূপ দিতে চায় বলেও জানান তিনি।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল, ১১ দলের অলি আহমদ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই প্রার্থীর কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে আজ দুজনের মধ্যে ভোট হবে।
জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেয়ার সুযোগ নেই।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন
বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর সাতজন রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এবার দুই প্রার্থী থাকায় প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হতে যাচ্ছে।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন এই নির্বাচনকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে বলেন, ‘বিশ্ববাসীরও এ নির্বাচনের দিকে নজর রয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে এবং এর পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।’
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নির্বাচন
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজ ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শুক্রবার শপথ
নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীই হবেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। আগামীকাল (শুক্রবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে তার শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্ণাঢ্য এ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিকসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত থাকতে পারেন।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। শপথ গ্রহণের পর নতুন রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ভোটের পরপরই নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বৃহস্পতিবারের দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।





