১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ৫ দশকে দেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হয়ে উঠেছে জাপান। মেট্রোরেল, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী উন্নয়ন প্রকল্পে রয়েছে দেশটির সহযোগিতা।
স্বাধীনতার পর ২ দেশের সম্পর্ক জোরদারে বিভিন্ন সময়ে উচ্চপর্যায়ের সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে দেশটি সফর করেন। এসব সফরের ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এবার জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তিনি। আলোচনায় গুরুত্ব পাবে অংশীদারিত্ব-বিনিয়োগ-রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি।
এবারের সফরে বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রত্যাশা জাপানি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ১৪ বিলিয়ন ডলারে একটি সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব সামনে রাখছে ঢাকা। এতে রয়েছে ১২টি অগ্রাধিকার খাত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানের বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে আস্থা অর্জনে ব্যবসা সহজ করা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রোসেসগুলো অনেক বেশি জটিল। অনেকদিন ধরে জাপানি বিনিয়োগকারীরা এটা বলে আসছে যে, তারা অনেক সময় নতুন একটি ব্যবসা বা উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে বেশ জটিলতার সম্মুখীন হন। সেক্ষেত্রে স্পেশাল সেলের মাধ্যমে কীভাবে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ওদের সার্ভিসটা আরও অনেক বেশি দ্রুতগতির করা যায় সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। এই প্রোসেসটা যদি কমপ্লিকেটেড থাকে, অনেকে বিনিয়োগে আগ্রহী থাকলেও অনেক বাধার সম্মুখীন হয়।’
আরও পড়ুন:
বিনিয়োগের পাশাপাশি অন্যতম লক্ষ্য জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়ানো। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করার সুযোগ হবে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। গত ৫ অর্থবছরেই বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম বলেন, ‘জাপানে এক্সপোর্ট বাড়াতে হলে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ওদের পণ্যের যে মানদণ্ড, তাদের যে প্রোডাক্ট কমপ্লায়ান্স— এগুলোর তাদের যে সার্টিফিকেশন আছে, সেগুলো যদি আমরা ফিলআপ না করতে পারি, তাদের যে রিকয়্যারমেন্ট, আমাদের দিক থেকে আমরা যদি সক্ষমতা না বাড়াই, আমাদের যদি প্রোডাকশনের কোয়ালিটি বাড়াতে না পারি, তাহলে হয়তো ইপিআই চুক্তি থাকলেও হয়তো সেটা কাজে লাগাতে পারবো না।’
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বাইরে জাপানের কাছ থেকে প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা নেয়ার পরামর্শ সাবেক এই কূটনীতিকের।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর আশরাফ-উদ-দৌলা বলেন, ‘প্রতি বছর যদি ৫০০ থেকে ১ হাজার শিক্ষক যদি আমরা পাঠাতে পারি, তাহলে তাদের শিক্ষা কারিকুলাম ও পদ্ধতিগুলো আমরা জানতে পারি, মানুষকে দক্ষ নাগরিক হিসেবে তৈরি করার পদ্ধতিগুলোও জানতে পারি। এর চেয়ে আর বড় কিছু চাওয়ার নেই বাংলাদেশের।’
সরকার প্রধানের এ সফরে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে নতুন সহযোগিতা কী কী যোগ হচ্ছে— সেটি এখন দেখার বিষয়।




