বেসরকারি খাতকে সহায়তা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে। এতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল ও ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থয়ান তহবিল দেয়া হবে। সে অনুযায়ী ফান্ড সংগ্রহে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ১৭টি এবং কৃষির ঋণের জন্য ৪৩টি ব্যাংকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ভিন্ন ভিন্ন খাতে সোনালী ব্যাংক সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকায় ফান্ড গঠনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে চার মাসেও খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি বিতরণ কার্যক্রমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও মিলেছে প্রত্যাশিত গতি না আসার চিত্র। বরাদ্দের ৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৫টি খাতে প্রক্রিয়াধীন ও বিতরণকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেক আবেদন চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেগুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখেছে এবং বিতরণও শুরু হয়েছে।’
আরও পড়ুন
সোনালী ব্যাংকের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার আবেদন পেয়েছে তারা। সিএমএসএমই খাত ও কৃষিতে প্রায় ৩শ জনকে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা প্রদানের দাবি অগ্রণী ব্যাংকের। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বড় আবেদনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবকারীর ঋণের অবস্থান যাচাই করা হচ্ছে।
অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারসোমা আলম বলেন, ‘ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটা ভালো একটা সুযোগ। তারা এখন এগিয়ে আসছে, তারা শাখায় যোগাযোগ করছে এবং প্রস্তাব আসছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করে যত দ্রুত সম্ভব আমরা দেয়ার চেষ্টা করছি।’
সোনালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান বলেন, ‘যারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের বেশিরভাগই কিন্তু এখনও কিন্তু তাদের ঋণগুলো অনিয়মিত আছে। সেগুলা আগে নিয়মিতকরণ করতে হবে, এরপরে কিন্তু প্রণোদনার আওতায় ঋণ দেয়া যাবে।’
এদিকে ঘোষিত প্রণোদনা স্কিমে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংকের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সরকারের নীতি সহায়তাসহ গ্রাহকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক চান তারা।
টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক অধ্যাপক মেহেদী রহমান বলেন, ‘নীতিগত কিছু সমস্যা আছে। ত্রিমুখী সমস্যা আছে। এই যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, কর্মাশিয়াল ব্যাংক এবং গ্রাহকদের মধ্যে মিটিং হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক কি ছাড় দিতে পারে আর কর্মাশিয়াল ব্যাংক কি করতে পারে এবং আমরা কি করতে পারি এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা না হলে কাজ টা ভালোভাবে আগাবে না।’
আরও পড়ুন
পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটে থাকা কারখানাগুলো কম সুদে নগদ প্রবাহ বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে এই প্রণোদনা। অন্তত ৫০০ কারখানা চালু করা গেলেও ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে এ সুবিধা পান, সেটি নিশ্চিত করবে হবে।
বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যাদের কারখানায় কাজ চলছে, কিংবা টাকার জন্য কাজ বন্ধ আছে তাদের জন্য এটা খুব ভালো হবে।’
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘কারখানার নামে টাকা নিয়ে সে টাকা যেন পাঁচার না হয় সে বিষয়ে নজরদারি রাখা উচিত।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ বা প্রণোদনার অর্থ উৎপাদনশীল খাতে না গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না বরং উদ্দেশ্য বিফলে যাবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ নেয়ার পর তা যদি কর্মসংস্থান তৈরির পেছনে কাজে না লাগানো যায়, তাহলে তো আর সে ঋণ দিয়ে কোনো লাভ হলো না।’
দুর্বল যাচাই-বাছাই ও ব্যাংকগুলোর কার্যকর তদারকি না থাকলে নতুন ঋণ আবারও খেলাপিতে রূপ নেয়ারও ঝুঁকি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।



