এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো নিয়ে জানা-অজানা

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো | ছবি: এখন টিভি
0

ফুটবল বিশ্বকাপ দেশের সীমানা পেরিয়ে এক মহোৎসবের আসর। বিশ্বকাপ ঘিরে উত্তর আমেরিকার ১৬ শহরে এখন সাজ সাজ রব। মেক্সিকোর ঐতিহ্য, কানাডার আধুনিকতা আর আমেরিকার গতির মিশেলে বৈচিত্র্যময় এক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় পুরো দুনিয়ার ফুটবলপ্রেমীরা। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এর জন্য প্রস্তুত মেক্সিকো সিটি থেকে টরোন্টো কিংবা আটলান্টা থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টেডিয়ামগুলো।

এস্তাদিও অ্যাজটেকা

ফুটবলের ‘পবিত্র ভূমি’ হিসেবে পরিচিত এস্তাদিও অ্যাজটেকা। আসন্ন বিশ্বকাপে ইতিহাসের স্বাক্ষী হতে যাচ্ছে মেক্সিকো সিটির এ স্টেডিয়ামটি। ২০২৬ সালে এটি বিশ্বের একমাত্র স্টেডিয়াম হতে যাচ্ছে, যেখানে ৩টি ভিন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ আসরের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। পেলের ১৯৭০-এর জয় এবং ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—সবই হয়েছিল এই মাঠেই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ২০০ ফুট ওপরের এ স্টেডিয়াম।

মার্সিডিজ-বেঞ্জ

স্থাপত্যের বিস্ময় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম। অন্যান্য স্টেডিয়ামের মতো সাধারণ ছাদ নয় ‘ক্যামেরা অ্যাপারচার’-এর মতো খোলা বা বন্ধ করা যায়। এর ৮টি বিশাল পাপড়ি যখন ঘোরে, তখন মনে হয় যেন একটি ফুল ফুটছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ৩৬০ ডিগ্রি ‘হ্যালো বোর্ড’, যা ১ হাজার ১০০ ফুট লম্বা। দর্শকরা স্টেডিয়ামের যে প্রান্তেই বসুক না কেন, চোখের সামনে বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিন থাকবেই।

সো-ফাই

বিশ্বের ব্যয়বহুল ভেন্যু লস অ্যাঞ্জেলেস সো-ফাই স্টেডিয়াম, যা নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এটি মূলত মাটির নিচে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে যাতে বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচলে সমস্যা না হয়। এর ছাদটি স্বচ্ছ ইটিএফই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি, যা বাইরের আলো ভেতরে আসতে দেয়, কিন্তু তাপ আটকে রাখে। এর ছাদটি আবার এক বিশাল বড় প্রজেকশন স্ক্রিন হিসেবেও কাজ করে, যা বিমান থেকে ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়।

সিয়াটল

বিশ্বের সবচেয়ে শব্দবহুল সিয়াটল স্টেডিয়াম। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার সরাসরি মাঠের ওপর প্রতিফলিত হয়। এটি একবার বিশ্বের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ স্টেডিয়াম হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেছিলো। এখানে ম্যাচ চলাকালীন শব্দের তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে, খেলোয়াড়দের কথা বলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘নয়েজ ক্যাসেল’।

টরন্টো

কানাডার টরোন্টো স্টেডিয়ামটি ঐতিহাসিকভাবে ছোট হলেও বিশ্বকাপের জন্য এখানে অস্থায়ীভাবে ১৫ হাজার আসন বাড়ানো হয়েছে। এটি উত্তর আমেরিকার একমাত্র স্টেডিয়াম যেখানে প্রাকৃতিক ঘাসের নিচে অত্যাধুনিক ‘আন্ডার-পিচ হিটিং সিস্টেম’ আছে। ফলে হাড়কাঁপানো শীতেও মাঠ জমে বরফ হবে না এবং ঘাস থাকবে সবুজ ও সতেজ।’

যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি ভেন্যু যেন আধুনিক প্রকৌশলের বিস্ময়। আটলান্টায় যখন আকাশছোঁয়া মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বল গড়াবে, তখন প্রযুক্তির চূড়া দেখবে বিশ্ব। সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে তৈরি হয়েছে বিশালাকার মেটাল ভাস্কর্য, যা জানান দিচ্ছে—স্বাগতিকরা প্রস্তুত। তবে শুধু স্টেডিয়াম নয়, হাই-স্পিড ট্রেন নেটওয়ার্ক আর ফ্যান জোনের অবকাঠামো পাল্টে দিচ্ছে এই শহরগুলোর চেনা চেহারা।

ইতিহাসের ডাক দিচ্ছে মেক্সিকো। এস্তাদিও অ্যাজটেকা হতে যাচ্ছে প্রথম ভেন্যু, যা তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের সাক্ষী হয়ে থাকবে। সংস্কারের ছোঁয়ায় এ ঐতিহাসিক দুর্গ এখন নতুনের অপেক্ষায়। ওদিকে উত্তরে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার এবং টরন্টোতে বইছে উৎসবের হাওয়া। বিসি প্লেস স্টেডিয়ামের নতুন ফাইবার অপটিক লাইটিং আর দৃষ্টিনন্দন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পর্যটকদের জন্য তৈরি করছে এক নতুন অভিজ্ঞতা।

তবে ১৬ শহরের এ আয়োজন মোটেও সহজ ছিলো না। বিশাল এ মহাদেশের টাইমজোন আর দূরত্বের চ্যালেঞ্জ সামলাতে তৈরি হয়েছে ‘রিজিওনাল ক্লাস্টার’; অর্থাৎ লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ভ্যাঙ্কুভার—যাতায়াত হবে সহজ, কমবে কার্বন নিঃসরণও। এটিই হতে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রথম ‘গ্রিন ওয়ার্ল্ড কাপ’।

স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর ফুটবলীয় আবেগের এক অদ্ভূত মেলবন্ধন। ১৬টি শহর, তিনটি দেশ—কিন্তু লক্ষ্য একটাই। অপেক্ষা এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন পুরো পৃথিবী এক বিন্দুতে মিলে বলবে— ‘লেট দ্য গেমস বিগিন’।

তিন দেশের এ আয়োজন কেবল ফুটবলের নয়, বরং আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক নতুন উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাতে যাচ্ছে। ১৬ শহরের এ মহাযজ্ঞে জয় হবে ফুটবলের, জয় হবে ঐতিহ্যের—এমনই প্রত্যাশা ফুটবল ভক্তদের।

এসএইচ