জানা যায়, শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের এ ধর্মপল্লীটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪২ সালে। পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে ৪২ একর জমি জুড়ে স্থাপন করা হয় এ তীর্থ স্থানটি। যা ১৯৯৮ সালে ঘোষণা করা হয় ফাতেমা রানীর তীর্থস্থান হিসেবে। সেই থেকে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার একটি মূল সুরের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে দু’দিনব্যাপী ফাতেমা রানীর তীর্থ উৎসব।
তাই প্রতি বছরের মতো এবছরও দুদিনের তীর্থ উৎসবে যোগ দিতে এই ধর্মপল্লীতে এসেছিল বিভিন্ন বয়সী হাজারো খ্রিস্ট ভক্ত। এবছর গতকাল (বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর) পুনর্মিলন ও পাপ স্বীকারের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় কর্মসূচি। ওইদিন রাতে হাজারো তীর্থযাত্রী নিজেদের পাপ থেকে মুক্তি পেতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোর মিছিল নিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার আড়াই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে।
আয়োজকরা জানান, এবারের উৎসবের মূলসুর ‘মানবতার জননী ফাতেমা রানী মা মারিয়া’।
তাদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেয়ার পাশাপাশি এ উৎসব মানুষের মধ্যে শান্তি, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করবে। তবে এআই প্রযুক্তির বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ধর্মগুরুরা।
তীর্থউৎসবে আসা নারী খ্রিস্টভক্ত মারিয়া চিসিম বলেন, ‘ফাতেমা রানীর তীর্থ উৎসবে অংশ নিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। প্রতি বছর এই তীর্থ উৎসব আমাদের কাছে আত্মিক শান্তি, প্রার্থনা ও মিলনের এক বিশেষ উপলক্ষ হয়ে আসে। আমরা এখানে দেশ ও জাতির মঙ্গল, শান্তি এবং পরিবারের সবার জন্য কল্যাণ কামনা করে প্রার্থনা করেছি। আশা করি, এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।’
পুরুষ খ্রিস্টভক্ত জোসেফ রোজারিও জানান, ফাতেমা রানীর তীর্থ উৎসব আমাদের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন। এই উৎসবে দেশের দূরদূরান্ত থেকে আসা হাজারো পুণ্যার্থী একসঙ্গে প্রার্থনায় অংশ নিয়েছেন। এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তাও বহন করে। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে এবারের উৎসব সম্পন্ন হওয়ায় আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।
আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী মিশনের ফাদার তরুণ বানোয়ারী আরও বলেন, ‘আবহাওয়া ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যবারের তুলনায় এবার ভক্তদের উপস্থিতিও বেশি ছিলো।’
পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি আয়োজক কমিটি ও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। তাই সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় এবারের তীর্থ উৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে।’
ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেন পৌল কুবি জানান, ফাতেমা রানী মা মারিয়ার এই তীর্থ উৎসব আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় আয়োজন। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করি। তিনি যেন আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষকে শান্তিতে রাখেন। আমরা এবার এই প্রার্থনা করছি যেন, পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠে।
তিনি আর বলেন আমরা চাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেন একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং সকলেই যেন মানুষের কল্যাণে কাজ করে। যিশুখ্রিষ্টের শিক্ষা আমাদের ভালোবাসা, শান্তি ও মানবসেবার পথ দেখায়। এই তীর্থ উৎসবের মধ্য দিয়ে সেই মানবতার বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি আশা করি, এই আয়োজন আমাদের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা জোগাবে।





