চক্রটি শুধু জাল নথি তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রায়োরিটি’ সিল নকল এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর খুলে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারেরও চেষ্টা করেছে বলে দাবি করছেন ডিএমপি কর্মকর্তারা।
গ্রেপ্তাররা হলেন— মো. ফারুক হোসেন (৪১), সাকিব খান (২৫), মাসুম মুনসী (৪৩), মীর তৌহিদুল ইসলাম (৩৬) এবং মো. বকুল মণ্ডল (৪৩)।
আজ (মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবির প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
ডিবিপ্রধান বলেন, ‘চক্রটি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রভাব বিস্তার, ভুয়া সুপারিশপত্র তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের তদবিরের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতো।’
তিনি বলেন, ‘তদন্তে উঠে এসেছে, গ্রেপ্তার মো. ফারুক হোসেন ২০০৬ সালে তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের “সাত টিটিসি স্থাপন” প্রকল্পে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৪ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর চাকরি ফিরে পেতে তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রী, চারজন মন্ত্রী, বিভিন্ন প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিল, স্বাক্ষর ও অফিসিয়াল লেটারহেড জাল করে একটি ফাইল প্রস্তুত করেন। ওই ফাইলে চারজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর জাল স্বাক্ষর সংযুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর “প্রায়োরিটি” সিলের নকল ব্যবহার করে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।’
ডিবিপ্রধানের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে ফারুক হোসেন চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টার পাশাপাশি একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র গড়ে তোলেন। তারা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হয়ে তদবির বাণিজ্য চালাতে শুরু করে। শুধু লিখিত নথি জালিয়াতির মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হত। একই কৌশলে মলদোভায় জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত একটি জাল সুপারিশপত্রও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ৪ আগস্ট মাদারীপুরের কালকিনি এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ফারুক হোসেন ও সাকিব খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের প্যাডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের অফিসিয়াল লেটারহেড উদ্ধার করা হয়। একইসঙ্গে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদারীপুর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় মীর তৌহিদুল ইসলামকে। এছাড়া কালকিনি থানা পুলিশের হেফাজতে থাকা মাসুম মুনসীকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। তদন্তে জানা গেছে, মাসুম মুনসী ও তৌহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে জাল সিল ও সই তৈরি করতেন। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের আরেক সদস্য মো. বকুল মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
অভিযানে চক্রটির কাছ থেকে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সিল ও স্বাক্ষর সম্বলিত ৪১টি সিল, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত আটটি মোবাইল ফোন, দু’টি কম্পিউটার এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা ডিজিটাল ডিভাইস ও নথি ফরেনসিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে চক্রটির কার্যক্রমের পরিধি, সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং অন্য সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং তদন্তে যদি আরও কারও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’





