লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের গভর্নর আলেক্সান্দর দ্রোজদেঙ্কো জানিয়েছেন, সেন্ট পিটার্সবার্গ ঘিরে থাকা এলাকায় ১৪০টিরও বেশি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। অন্যদিকে শহরের গভর্নর আলেক্সান্দর বেগলভ যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডার ও একটি নৌঘাঁটিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়ার হামলার বিরুদ্ধে এটি একটি ‘যুক্তিসঙ্গত জবাব’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
এর আগের দিন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ফোরামে বলেছিলেন, ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করার কোনো অর্থ নেই। অথচ জেলেনস্কি যুদ্ধ অবসানে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জেলেনস্কি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ করার সময় এখনই।’ তবে তিনি অভিযোগ করেন, রুশ নেতা যুদ্ধ চালিয়ে যেতেই বেশি আগ্রহী।
জেলেনস্কি আরও জানান, তার দেশের ড্রোনগুলো ১ হাজার কিলোমিটার (৬২০ মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করে সেন্ট পিটার্সবার্গে আঘাত হেনেছে। রাশিয়ার নৌবাহিনীর বাল্টিক নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি ক্রনস্ট্যাডের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, লক্ষ্যবস্তু ছিল ‘শত্রু নৌবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডার এবং ক্রনস্ট্যাডের একটি ঘাঁটি’।
দ্রোজদেঙ্কো বলেছেন, ইউক্রেনের হামলায় একটি সামরিক স্থাপনায় আগুন লেগেছে। স্থাপনাটির নাম প্রকাশ করেননি তিনি। এ ঘটনায় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, কিছু ভবন ‘সামান্য’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলেনস্কির দাবি, ইউক্রেনের ‘দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা’র (রাশিয়ার ওপর চালানো হামলার ভিন্ন নাম) অংশ হিসেবে ৫০০ কিলোমিটার (৩১০ মাইল) দূরে দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদর অঞ্চলের একটি তেলের ডিপোতেও হামলা চালানো হয়েছে।
পুতিনের উদ্বোধনী অর্থনৈতিক ফোরাম শুরুর কয়েক দিন আগেই সেন্ট পিটার্সবার্গের উপকণ্ঠে ইউক্রেনের হামলার পরই এসব হামলার ঘটনা ঘটল।
দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে ১৩০টি দেশ থেকে হাজার হাজার অতিথি যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি স্বল্প-পরিসরের মার্কিন প্রতিনিধিদলও ছিল।
বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর থেকে চলা এই যুদ্ধ অবসানে যুদ্ধবিরতি এবং পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানান। একটি খোলা চিঠিতে তিনি লেখেন, এই সংঘাত যেন আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নজরে আসে—সেই অপেক্ষায় বসে থাকা ‘ভুল’ হবে।
শুক্রবার অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্যে পুতিন এই বৈঠকের প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি আবারও তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, যুদ্ধবিরতি কেবল ইউক্রেনকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে। পুতিনের দাবি, রাশিয়ার লক্ষ্য পূরণ হলেই কেবল তিনি এই যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন।
রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল থেকে সরে আসতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে। তবে ইউক্রেন কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, মস্কোকে ছাড় দেয়া হলে ভবিষ্যতে তারা আবারও আক্রমণ চালানোর সাহস পাবে।
এদিকে পূর্ব ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত লুহানস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার লজিস্টিকস বা সরবরাহ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি মহাসড়কে কোচ সার্ভিস স্থগিত করেছে মস্কো-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ। তারা ‘নিরাপত্তার কারণে’ এসব সড়ক ব্যবহার না করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ জানিয়েছে।
রাশিয়া-সমর্থিত প্রশাসন লুহানস্কের ভেতরে যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস এবং শিশুদের দলবদ্ধভাবে চলাচলও নিষিদ্ধ করেছে। পুতিন আগে বলেছিলেন, তথাকথিত ‘লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক’ পুরোপুরি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনী ইউক্রেনের অধিকৃত এলাকায় রাশিয়ার লজিস্টিকস স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বিবিসিকে এক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি লরি এবং ৩০টিরও বেশি জ্বালানি ট্রাকে আঘাত হানা হয়েছে।
রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর থেকে গত চার বছরে নিজেদের প্রতিরক্ষা খাত ব্যাপকভাবে উন্নত করেছে ইউক্রেন। কিয়েভ এখন নিয়মিতভাবে রাশিয়ার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। মূলত জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল স্থাপনাকে তারা টার্গেট করছে, কারণ এগুলোই মস্কোর যুদ্ধ-যন্ত্রকে সচল রাখছে বলে মনে করে কিয়েভ।





