এতদিন কোথায় ছিল খামেনির মরদেহ?

তেহরানে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনের পাশে রাখা হয়েছে নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিনও
তেহরানে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনের পাশে রাখা হয়েছে নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিনও | ছবি: সংগৃহীত
0

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছিলেন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায়। কিন্তু তার দাফন হতে যাচ্ছে চার মাস পর, আগামী ৯ জুলাই। ইসলামি রীতিতে মৃত্যুর পর দ্রুততম সময়ে দাফনের নির্দেশনা থাকলেও এত দীর্ঘ বিলম্ব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে এতদিন কোথায় ছিল প্রয়াত এই নেতার মরদেহ? এত সময় ধরে সেটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো? টাইমস অব ইন্ডিয়ার ও আনাদোলুর প্রতিবেদনে এসব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ ওমর জানিয়েছেন, খামেনির মরদেহ প্রায় নিশ্চিতভাবেই হিমায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে (রেফ্রিজারেটেড কোল্ড স্টোরেজ)। কারণ ইসলামি রীতিতে রাসায়নিক এম্বালমিং বা মরদেহে রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ নিষিদ্ধ। তার মতে, শিয়া আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে দাফন বিলম্বিত করার এবং ঠান্ডায় সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের এই ধরনের ছাড় পাওয়া কঠিন কিছু নয়। ইরানের ফরেনসিক মর্গগুলোতে এমনিতেই মাসের পর মাস মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, তাই চার মাস হিমঘরে রাখা কোনো ব্যতিক্রম নয়। যুদ্ধকালীন অস্থিরতা ও শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই দাফন প্রক্রিয়া এতদিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এখন খামেনির জন্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় জানাজার প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। আজ (শুক্রবার, ৩ জুলাই) তেহরানে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শনিবার ও রোববার তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লা কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষের জন্য শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থাকবে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু তেহরানেই তিন দিনে এক কোটির বেশি মানুষের সমাগম হবে। ৬ জুলাই তেহরানে বিশাল শোক মিছিলের পর মরদেহ নেয়া হবে পবিত্র শহর কোমে। এরপর ৮ জুলাই তা নেয়া হবে ইরাকের নাজাফ ও কারবালার পবিত্র মাজারে। সবশেষে ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারের কাছে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। এটি খামেনির নিজের জন্মস্থান এবং তার ওসিয়ত অনুযায়ীই এখানে দাফন করা হচ্ছে।

তবে এই বিশাল আয়োজন ঘিরে অতীতের দুটি বিয়োগান্ত ঘটনার ছায়া ইরান কর্তৃপক্ষকে ভাবিয়ে তুলছে। ১৯৮৯ সালে বিপ্লবের রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল সামলাতে না পেরে কফিন ছিঁড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হেলিকপ্টারে করে মরদেহ সরিয়ে নিতে হয়েছিল। ওই ঘটনায় বহু মানুষ আহত ও নিহত হন। ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানির জানাজায় কেরমান শহরে পদদলিত হয়ে অন্তত ৫৬ জন প্রাণ হারান। এসব ‘জানাজা বিপর্যয়’ যাতে খামেনির দাফনে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

খোরাসান রাজাভি প্রদেশের গভর্নর গোলামহোসেন মোজাফফরি জানিয়েছেন, ভিড় সামলানো এবং কফিন নিরাপদে সরানোর জন্য প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হতে পারে। শীর্ষ নেতাদের সুরক্ষা, কোটি কোটি শোকার্তদের ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের একাধিক শহরে কফিন পরিবহনের কাজটি ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তা অভিযান হতে যাচ্ছে। তেহরান শহরে ৪২০টি সেবা কেন্দ্র এবং ১ হাজার ৬৩৫টি জায়গায় শোকার্তদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রখর গ্রীষ্মের কথা মাথায় রেখে তিনটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সমন্বিতভাবে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে।

ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি জানিয়েছেন, বিশ্বের ৪০টি দেশ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিদল এবং ৯০টি দেশ থেকে বিভিন্ন খাতের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এই জানাজায় অংশ নেবেন। নিশ্চিতকৃত অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এমোমালি রহমন, ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমিদি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান কাভার করতে ১৪ হাজার সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যাদের মধ্যে ৯০০ জনের বেশি বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন।

এদিকে জানাজার অনুষ্ঠান ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধের রেশ কাটেনি। ইরানের ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডাররা সপ্তাহব্যাপী এই কর্মসূচির সময় ইসরাইলকে কোনো ধরনের ‘ভুল হিসাব’ না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ঐতিহ্যগতভাবে জানাজার নামাজে ইমামতির দায়িত্ব কে পালন করবেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। বাবার মৃত্যুর পর আত্মগোপনে থাকা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন, যদিও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে চার মাস হিমঘরে থাকা খামেনির মরদেহের চূড়ান্ত ঠিকানা হবে মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণ।

এএম