রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ এই দাফন সম্পন্ন হওয়ার খবর জানিয়েছে। খামেনির দাফন এমন সময়ে হলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এই হামলার কারণে যে যুদ্ধে খামেনি প্রাণ হারান, সেটি বন্ধ করতে সই হওয়া প্রাথমিক চুক্তিটিও ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড অভিযোগ করেছে, ‘শেষকৃত্যের আলোচনাকে আড়াল করার চেষ্টায়’ যুক্তরাষ্ট্র রাজধানী তেহরান থেকে মাশহাদগামী রেলপথের দুটি সেতুতে রাতভর বোমা হামলা চালিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে খামেনির বাসভবনে ইসরাইলি হামলায় তিনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রথম দিনই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেয়া তার ছেলে মুজতবা ওই একই হামলায় গুরুতরভাবে আহত হন বলে জানা যায়। এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ৫৬ বছর বয়সী মুজতবা তেহরান ও কোমের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও অংশ নেননি। দাফন অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতির কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার সকালে আয়াতুল্লাহ খামেনি, তার নাতনি, জামাতা, মেয়ে এবং মুজতবার স্ত্রীর কফিনবাহী একটি বিমান ইরাক থেকে মাশহাদে অবতরণ করে। ইরাকের নাজাফ ও কারবালা এই দুটি পবিত্র শিয়া নগরীতে বিপুল সংখ্যক মানুষ শোকযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন।
বিকেলে ইরানি টিভির ফুটেজে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় মাশহাদের একটি প্রধান সড়ক ধরে কালো পোশাক পরা হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ হাঁটছেন। অনেকেই ইরানের পতাকা এবং প্রতিশোধের প্রতীক লাল ব্যানার নাড়াচ্ছিলেন।
কেউ কেউ প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছবি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মৃত্যু কামনা করে প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন। চার মাস আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্পই ইরানে যৌথ হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা এই যুদ্ধের সূত্রপাত করে। সড়কের ওপর ‘আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে’ এমন সরকারি স্লোগানসংবলিত ব্যানারও ঝুলছিল।
৩৫ বছর বয়সী গৃহিণী হোদা এএফপিকে বলেন, ‘নেতাকে হারানো আমাদের বাবা-মাকে হারানোর চেয়েও কষ্টের। শুধু ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মৃত্যুই আমাদের ব্যথা কমাতে পারবে।’
পরে একটি লরিতে করে খামেনির কফিন ধীরে ধীরে জনতার মধ্য দিয়ে ইমাম রেজার মাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত নামতেই সেটি মাজার প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। শিয়াদের অষ্টম ইমাম এবং ১২ ইমামের মধ্যে একমাত্র ইমাম রেজাকে ইরানে দাফন করা হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। নবম শতাব্দীতে নির্মিত সুউচ্চ সোনালি গম্বুজ ও মিনারবিশিষ্ট এই মাজারে প্রতি বছর লাখ লাখ তীর্থযাত্রী আসেন।
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদেই খামেনির জন্ম। ইরানের শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র কোমে যাওয়ার আগে তিনি এই শহরের বিভিন্ন মাদ্রাসাতেই পড়াশোনা করেছেন। ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত হন।
ক্ষমতায় থাকা ৩৭ বছরে তিনি ইরানের রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। কখনো কখনো সহিংসভাবে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ দমন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতসহ বিদেশি বিষয়েও তিনি ধারাবাহিকভাবে কট্টর অবস্থান নিয়েছিলেন।
যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পর এবং জানুয়ারির গণবিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে আরও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্ব খামেনির এই সাজানো শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐক্য ও শক্তির বার্তা দিতে চেয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের কারণে এই জনশোকযাত্রায় ছেদ পড়েছে।
বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় রাতের হামলার পর ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, মার্কিন হামলা ‘আরও অনেক খারাপ’ হতে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর ইরানের সক্ষমতা কমাতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী এর জবাবে কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
তিন সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল। এতে সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই পক্ষকে দুই মাসের সময়ও দেয়া হয়েছিল।
গত সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারী কাতার জানিয়েছিল, চার দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পর দোহায় পরোক্ষ আলোচনায় ইরানি ও মার্কিন আলোচকরা অগ্রগতি করেছেন এবং খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তাদের পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে বুধবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তার বিশ্বাস, এই এমওইউ এখন ‘শেষ’ হয়ে গেছে।





