বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে তাতে আমাদের অংশ নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এতে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, সৌদি আরবই ঢাকাকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা তিনি জানাননি। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা কথা বলেন।
নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সামনে পরীক্ষা
মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। বাংলাদেশ এত দিন প্রতিদ্বন্দ্বী ভূ-রাজনৈতিক জোট থেকে দূরে থেকে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ ধরে রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য।
ঢাকার অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব পণ্যের বড় বাজার যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্সও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। এসব শ্রমিকের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, ‘কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়ার পর বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ খুশি হবে না। তবে সেটিই বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।’
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, মক্কা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিলে ভারত ছাড়াও চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এসব সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না। তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে, বাংলাদেশ কোন পক্ষের সঙ্গে আছে এই প্রশ্ন এড়ানো অনেক কঠিন হয়ে যাবে।’
চুক্তির ধরন কী
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি এই চুক্তির মূল শর্ত হলো, তিন সদস্যের কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায়। তিন দেশই সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তুরস্কের সেনাবাহিনী ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক। তুরস্ক জানিয়েছে, চুক্তিটি আরও দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উন্মুক্ত। তবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে, এটি প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
বাংলাদেশও তুরস্কের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র। তবে দেশটির ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের সুন্নি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন। ফলে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য থাকলেও সামরিক জোটে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে ঢাকার প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতির বাইরে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে বলে মনে করছেন একাধিক বিশ্লেষক।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন জটিলতা
মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার সম্ভাবনার কথা এমন সময় সামনে এলো, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী জোর করে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চাচ্ছে ঢাকা। এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো ভারত সফরের সিদ্ধান্ত নেননি। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধে নয়াদিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। চলতি মাসে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর ঢাকার পক্ষ থেকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছিল।
মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার বিষয়টি নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবে নেবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যখনই স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে, তখন এ ধরনের জোটে যোগ দেয়ার ঘোষণা নতুন করে সন্দেহ ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন হলো, ভারতের সম্ভাব্য অসন্তোষের কারণে কি এমন কোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত, নাকি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করা উচিত। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সিদ্ধান্তটি আবেগ বা কোনো দেশের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের হিসাবেই নিতে হবে।
ইরানকে ঘিরে নতুন সমীকরণ
মক্কা চুক্তির তিন সদস্য দেশ বলছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলা করাও এই জোটের একটি পরোক্ষ উদ্দেশ্য হতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে শীতল রয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলেও বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান প্রণালিটি অবরোধ করার পর ওই অঞ্চলের জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। দেশটির ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের পাল্টা হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে থাকা হুথি প্রশাসনের সঙ্গেও সৌদি আরবের উত্তেজনা আবার বেড়েছে। লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হুথি হামলার ঘটনাও ঘটছে।
মিশর কেন বাইরে রইল
মক্কা চুক্তির প্রাথমিক আলোচনায় মিশরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার দেশ মিশর গাজা যুদ্ধের অবসান, আফ্রিকার বিভিন্ন পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির নানা বিষয়ে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তুরস্ক মিশরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উল্লেখযোগ্য উদ্যোগও নিয়েছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু কায়রো এতে যোগ দিতে প্রস্তুত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মিশরকে বাদ দিয়েই চুক্তি এগিয়ে নেয়া হয়।
বাংলাদেশের সামনে হিসাব
মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ পেতে পারে। সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তুরস্ক ও পাকিস্তানও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহকারী। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। রপ্তানি ও বিনিয়োগের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও জাপানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য জরুরি।
এখনো বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ দেয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। ফলে মক্কা চুক্তিকে আপাতত সামরিক জোটে যোগ দেয়ার ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় সম্ভাব্য কৌশলগত বিকল্প যাচাই হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ঢাকা কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কতটা ধরে রাখা যায় তার ওপর।
-রয়টার্সের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





