ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা চুক্তি; নেপথ্যে সংকট কতটা গভীর

তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করছেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদ
তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করছেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদ | ছবি: সংগৃহীত
0

উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলার শঙ্কা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সংঘাত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পারস্পরিক তীব্র মতভিন্নতা ও দীর্ঘদিনের আস্থার ঘাটতির কারণে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ কোনো স্থায়ী আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে রূপ নেয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং তেল-গ্যাস অবকাঠামোতে আঘাত আসায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে উপসাগরীয় অর্থনীতি। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ এড়াতে তৎপর হলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কৌশলগত সংঘাত পুরো অঞ্চলকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।

তেহরানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও অনাক্রমণ চুক্তির প্রস্তাব
গত আগস্টে সম্পাদিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির তিন অংশীদার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি কাতারের কূটনীতিকেরা সম্প্রতি তেহরানে গিয়ে ইরানি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও তেল স্থাপনায় হুথিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্র কয়েক দিন পরই সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদের তেহরান সফর এই সংকট নিরসনের গুরুত্বকেই তুলে ধরে।

এদিকে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় সফরকালে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরানের মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অনাক্রমণ চুক্তি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর প্রধান নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকারী হিসেবে থাকবে না।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের অনড় অবস্থানের দেয়াল
আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ইরানে ফের সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়ে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নতুন কোনো আগ্রাসন চালানো হলে আরও কঠোর জবাব দেয়া হবে। ফলে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কাতার সম্প্রতি একটি খসড়া চুক্তি তেহরানের কাছে তুলে ধরলেও ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের দেয়া বেশ কিছু শর্ত অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান কোনো প্রকার ছাড় দেবে না। সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ বাতারফি আল জাজিরাকে জানান, সৌদি আরবের এই সফর ছিল একধরনের শেষ সতর্কতা। তবে তিনি বলেন, ‘পার্থক্য এখনও বিশাল এবং আস্থার তীব্র অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।’

স্থায়ী কাঠামোর বদলে বহুমুখী কূটনীতির প্রবণতা
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো আনিসে বাসিরি তাবরিজি আল জাজিরাকে জানান, আগামী কয়েক মাস বা বছরেও কোনো পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, ‘একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেই পুরোপুরি নেই।’ তার মতে, দেশগুলো বড় কোনো যৌথ কাঠামোর চেয়ে ছোট ছোট দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমেই সমাধান খুঁজছে।

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শর্ত পূরণের অগ্রাধিকার নিয়েই মূল মতবিরোধ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় পারমাণবিক বিষয়ে ইরান ছাড় দিক, অন্যদিকে ইরান চায় যুদ্ধ বন্ধের শর্ত আগে পূরণ হোক।’

আজিজি আরও জানান, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর দাবি জানালেও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা অংশীদারত্বে বহুমুখী রূপ আনার চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনও মেলেনি।

এএম