প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এই রদবদলে ফেদোরভকে বাদ দেয়ায় জনরোষ আরও বেড়েছে। ৩৫ বছর বয়সী এই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিয়েভের সৈন্যস্বল্পতায় থাকা সেনাবাহিনীকে আরও দক্ষ যুদ্ধ শক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিলেন।
রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কিয়েভের আকাশযুদ্ধের একজন শীর্ষ কমান্ডারও পদত্যাগ করেছেন।
আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের নির্বাহী সের্গেই কোরেৎস্কির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে ফেদোরভের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইহোর ক্লিমেনকো। এই পদক্ষেপ জেলেনস্কির নেতৃত্বের প্রতি আস্থায় চিড় ধরিয়েছে।
কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ফেদোরভ জানান, জেলেনস্কি তাকে উপদেষ্টা হিসেবে থাকার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ আটকে দেয়া এবং সরাসরি সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার অভিযোগ এনেছেন।
চিরচেনা সাদামাটা টি-শার্ট ও জিনস পরে ফেদোরভ বলেন, ‘রাশিয়াকে কীভাবে হারানো যায়, তা নিয়ে কাজ করার বদলে তিনি (সিরস্কি) দেশকে কীভাবে বিভক্ত করা যায়, তা নিয়ে ভাবছেন।’
৬০ বছর বয়সী সিরস্কি ২০২৪ সালের শুরু থেকে এই পদে রয়েছেন। তার কঠোর কমান্ড পদ্ধতির কারণে সেনা সদস্যদের প্রাণহানি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ রয়টার্সের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
আরও পড়ুন:
ফেদোরভকে বাদ দেয়ার বিষয়ে জেলেনস্কি এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি আশা করেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে।
বৃহস্পতিবার কোরেৎস্কির নিয়োগ অনুমোদন পেলেও অন্য মন্ত্রীদের বিষয়ে সংসদীয় ভোট পাস হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০২২ সালের শেষ দিকের পর থেকে ইউক্রেন এখন যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার তেল খাত ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত হেনে মস্কোর যুদ্ধযন্ত্রকে দুর্বল করে দিয়েছে তারা।
তবে সৈন্যের তীব্র সংকটের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে রুশ বাহিনীর ধীরগতির অগ্রযাত্রার মুখে পড়তে হচ্ছে কিয়েভের সেনাদের। এছাড়া মস্কো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা বাড়ানোর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিও রয়েছে।
ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম এনভির প্রধান সম্পাদক ভিতালি সিচ লেখেন, ‘কঠিন মুহূর্তে জেলেনস্কি বীরের মতো আচরণ করেন। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কঠিন মুহূর্তগুলো প্রায়ই তার নির্বোধ সিদ্ধান্তের কারণেই তৈরি হয়।’
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার এবং ড্রোন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নেতা পাভলো ইয়েলিজারভ ফেদোরভের অপসারণের প্রতিক্রিয়ায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য ‘বড় ধরনের ক্ষতি’ বলে অভিহিত করেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্রেমলিন এই রদবদলের ওপর নজর রাখছে। তবে কিয়েভ যদি শান্তি চুক্তির দিকে নিয়ে যায় এমন ‘দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত’ নিতে প্রস্তুত না হয়, তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোনো পার্থক্য তৈরি করবেন না।
কিয়েভে জেলেনস্কির কার্যালয়ের বাইরে এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী সমবেত হন। তারা ‘লজ্জা!’ স্লোগান দেন এবং ‘কীসের জন্য?’ ও ‘রুশরা উদযাপন করছে’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
আরও পড়ুন:
গত জুলাইয়ের বড় বিক্ষোভের কথা মনে করিয়ে দেয় এই দৃশ্য। সে সময় জনরোষের মুখে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার এক অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন জেলেনস্কি।
নিজের নাম আলী বলে পরিচয় দেয়া একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা উন্নতির পক্ষে, অবনতির পক্ষে নই।’ তিনি ফেদোরভকে একজন কার্যকর ও আধুনিক ব্যবস্থাপক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ফলাফল দেখছি, স্বাধীনতার জন্য আমাদের লড়াইয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখছি।’
অন্য বিক্ষোভকারীরা দাবি জানান, ফেদোরভের বদলে জেলেনস্কি যেন সিরস্কিকে অপসারণ করেন। বৃহস্পতিবার সংসদে ভোটাভুটির আগে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সেনা সদস্যদের কাছ থেকে ফেদোরভের পক্ষে সমর্থন আসতে থাকে।
এর আগে ফেদোরভ ইউক্রেনের প্রথম ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, ড্রোনযুদ্ধকে জোরদার করা এবং তথ্যভিত্তিক কৌশলে রাশিয়ার বাহিনীকে ক্লান্ত করে দেয়ার কৌশল অবলম্বন করেছেন তিনি। সমর্থকদের ভাষ্য, প্রতিরক্ষা ক্রয়ে স্বচ্ছতা আনার তার প্রচেষ্টা রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে। পাশাপাশি সেনা সংগ্রহ প্রক্রিয়ার সংস্কারে দ্রুত ফল দিতে না পারার জন্যও তিনি সমালোচিত হয়েছেন।
গত রোববার জেলেনস্কি এই সর্বশেষ রদবদলের ঘোষণা দেন, যা ব্যাপক বিস্ময় সৃষ্টি করে। তিনি যুক্তি দেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ‘নবায়ন’ প্রয়োজন।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে কোরেৎস্কি বলেন, তার সরকারের প্রধান কাজ হবে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন দিয়ে সেনাবাহিনীকে ‘পূর্ণাঙ্গভাবে সজ্জিত’ করা, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতকে সম্প্রসারিত করা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে রাশিয়ার হামলার আরেকটি শীতের জন্য প্রস্তুতি নেয়া।




