মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: তেল, ন্যাটো বাহিনী ও পরমাণু শক্তির ত্রিমুখী মেলবন্ধন

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পতাকা
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পতাকা | ছবি: সংগৃহীত
0

গত শুক্রবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। ইসরাইলের সম্প্রসারণশীল সামরিক তৎপরতা ও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এই তিন দেশ মিলে তৈরি হয়েছে একটি বিশাল সামরিক জোট। সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ, তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী এবং পাকিস্তান হলো মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ।

যৌথ স্থল, আকাশ ও নৌশক্তির চিত্র
২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’ অনুযায়ী, তিন দেশ মিলে সক্রিয় সেনা সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এ ছাড়া তাদের রয়েছে ৩ হাজার ৪০০ যুদ্ধবিমান, ৬ হাজার ট্যাংক এবং ৩৪০টির বেশি নৌযান। ১৪৫টি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার তালিকা তৈরিতে এই সূচকটি জনবল, সরঞ্জাম, প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে।

জনবল: পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা রয়েছে। এরপর তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের ২ লাখ ৪৭ হাজার সেনা রয়েছে।

আকাশশক্তি: যুদ্ধবিমানের সংখ্যায়ও এগিয়ে পাকিস্তান, তাদের রয়েছে ১ হাজার ৩৯৭টি বিমান। তুরস্কের কাছে আছে ১ হাজার ১০১টি এবং সৌদি আরবের ৯১৭টি সামরিক বিমান।

স্থলবাহিনী: তিন দেশ মিলে ট্যাংক রয়েছে ৬ হাজার ৪৬টি এবং সাঁজোয়া যান রয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি। ট্যাংকের সংখ্যায় পাকিস্তান শীর্ষে (২ হাজার ৬৭৭টি), এরপর তুরস্ক (২ হাজার ২৮৪টি) এবং সৌদি আরব (১ হাজার ৮৫টি)।

নৌশক্তি: যৌথ নৌবহরে রয়েছে ৩৪৪টি নৌযান, ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি করভেট এবং ২২টি সাবমেরিন। এখানে তুরস্ক শীর্ষে (১৯২টি নৌযান)।

প্রতিরক্ষা ব্যয়: তিন দেশের সম্মিলিত বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১২৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে সৌদি আরবের বাজেট সবচেয়ে বেশি ৬৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তুরস্কের বাজেট ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন এবং পাকিস্তানের ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।

পরিপূরক সামরিক শক্তি
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, এই চুক্তির গুরুত্ব হলো তিন দেশের সামর্থ্য একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব দিচ্ছে পুঁজি, ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক প্রভাব। তুরস্ক দিচ্ছে উন্নত প্রতিরক্ষা-শিল্পের ভিত্তি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, নৌ ব্যবস্থা এবং ন্যাটো থেকে অর্জিত সামরিক অভিজ্ঞতা।’ অন্যদিকে পাকিস্তান জোগান দিচ্ছে বিশাল জনবল, পেশাদার সামরিক বাহিনী, রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা, প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরমাণু শক্তি।

প্রতিটি দেশের জন্য জোটের অর্থ
সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বকে বৈচিত্র্যময় করার একটি সুযোগ। হরমুজ প্রণালি ও বাব-এল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ক্রমবর্ধমান হুমকির মধ্যে তুরস্কের উন্নত সামরিক সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের পরমাণু ঢাল রিয়াদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা দেবে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান বিশ্বের নয়টি পরমাণু অস্ত্রধারী দেশের একটি; ১৯৯৮ সালে দেশটি প্রথম পরমাণু পরীক্ষা চালায়। ২৫ কোটি জনসংখ্যার এই দেশ অস্ত্র আমদানির জন্য মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ১৯৫২ সালে ন্যাটোতে যোগ দেয়া তুরস্কের নিজস্ব পরমাণু অস্ত্র নেই। তবে ন্যাটোর পরমাণু-বণ্টন ব্যবস্থার আওতায় দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু ওয়ারহেড রয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আরব উপদ্বীপ বিষয়ক সাবেক পরিচালক ডেভিড দে রশ আল জাজিরাকে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র রপ্তানির অনিশ্চয়তার মধ্যে এই চুক্তি সৌদি আরবের অস্ত্র উৎস বহুমুখীকরণে সহায়ক হবে। তুরস্ক ও পাকিস্তান বড় পরিসরে ১৫৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেলের মতো সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি সৌদি আর্থিক বাজারে তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রবেশের পথ খুলে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও অন্য দেশের যোগদান
হার্ডক্যাসল অ্যাডভাইজরির ব্যবস্থাপনা অংশীদার জায়েদ এম বেলবাগি বলেন, ‘পাকিস্তান মার্কিন সহায়তা পায়, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিদেশি অস্ত্র ক্রেতা এবং তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী। ফলে এই চুক্তির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।’ ক্রিগ বলেন, গোয়েন্দা তথ্য, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও উচ্চমানের সামরিক প্রযুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আঞ্চলিক দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কেনার বদলে নিজেদের সম্পদকে কার্যকর শক্তিতে রূপান্তর করতে চাইছে।

এই জোটে অন্য যে দেশের যোগদানের কথা প্রকাশ্যে উঠে এসেছে সেটি হলো মিসর। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, কারিগরি বিষয়গুলোর সমাধান হলে কায়রো এই জোটে যোগ দেবে। ক্রিগ মনে করেন, মিসরের সামরিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান এবং সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটিকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে চ্যাথাম হাউসের করিম এলগেন্দি বলেন, মিসর তখনই এই জোটে যোগ দিতে পারে, যখন এর ভাষা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সহায়তা সম্পর্ক এবং বিদ্যমান শান্তি চুক্তিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

এএম